গবেষণা বলছে: রাগ প্রকাশ করলে কমে না, বরং বাড়তে পারে
রাগ প্রকাশ করলে কমে না, বরং বাড়তে পারে: গবেষণা

রাগ প্রকাশ করলে কমে না, বরং বাড়তে পারে: বৈজ্ঞানিক গবেষণা

রাগ ঝেড়ে ফেললেই মন হালকা হয়— এমন প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, রাগ প্রকাশ বা 'ভেন্টিং' করলে তা কমার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

১৫৪টি গবেষণার বিশ্লেষণে চমকপ্রদ ফল

বৈজ্ঞানিক বিষয়ভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ScienceAlert-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, Ohio State University-এর গবেষকরা রাগ নিয়ে করা ১৫৪টি গবেষণা পর্যালোচনা করেছেন। মোট ১০,১৮৯ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর পরিচালিত এসব গবেষণায় বয়স, লিঙ্গ, সংস্কৃতি ও জাতিগত বৈচিত্র্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও যোগাযোগবিজ্ঞানী ব্র্যাড বুশম্যান স্পষ্টভাবে বলেন, 'রাগ বের করে দিতে হবে'— এই ধারণা ভাঙা জরুরি। তার মতে, ক্যাথারসিস তত্ত্বকে সমর্থন করার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

রাগ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদ্ধতি

গবেষণায় উঠে এসেছে যে রাগ সামলাতে শরীর ও মনকে শান্ত করার কৌশলগুলো বেশি কার্যকর। বিশেষজ্ঞরা নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলোর পরামর্শ দিচ্ছেন:

  • ধ্যান ও মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন
  • গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম
  • প্রগ্রেসিভ মাসল রিলাক্সেশন
  • অল্প সময়ের বিরতি নেওয়া
  • ১০ পর্যন্ত গোনার মতো সহজ কৌশল

গবেষণার প্রধান লেখক ও ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির যোগাযোগবিজ্ঞানী সোফি জারভিক ব্যাখ্যা করেন, রাগ কমানোর মূল চাবিকাঠি হলো শরীরের উত্তেজনা বা 'অ্যারাউজাল' কমানো। জনপ্রিয় ধারণার বিপরীতে, দৌড়ানো বা উচ্চমাত্রার ব্যায়াম অনেক সময় উত্তেজনা বাড়িয়ে রাগও বাড়াতে পারে।

কোন ব্যায়াম কার্যকর, কোনটি নয়

গবেষকরা বিভিন্ন শারীরিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করেছেন:

  1. বক্সিং, সাইক্লিং, জগিংয়ের মতো উত্তেজনাবর্ধক কর্মকাণ্ড রাগ বাড়াতে পারে
  2. ধীরগতির যোগব্যায়াম ও মাইন্ডফুলনেস রাগ কমাতে কার্যকর
  3. আনন্দময় দলীয় খেলাধুলা শারীরিক উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হতে পারে
  4. ডায়াফ্রাম্যাটিক ব্রিদিং ল্যাব ও বাস্তব পরিবেশে উভয় ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে

বুশম্যান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কিছু ব্যায়াম হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী হলেও রাগ নিয়ন্ত্রণে তা সেরা সমাধান নাও হতে পারে। ভেন্টিং সাময়িক স্বস্তি দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদে আগ্রাসী আচরণকে শক্তিশালী করতে পারে।

গবেষণার তাত্ত্বিক ভিত্তি

এই গবেষণা Stanley Schachter ও Jerome Singer প্রস্তাবিত দুই-উপাদান তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী আবেগের একটি শারীরবৃত্তীয় ও একটি মানসিক দিক রয়েছে। আগের গবেষণায় মানসিক ব্যাখ্যা বদলানোর দিকে জোর দেওয়া হলেও, নতুন এই বিশ্লেষণে শারীরিক উত্তেজনা কমানোর দিকটি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

গবেষকরা উল্লেখ করেন, 'রেজ রুম'-এর মতো জায়গায় ভাঙচুর করে রাগ ঝাড়ার প্রবণতাও এই গবেষণার অনুপ্রেরণা ছিল। তবে তারা স্পষ্ট করেন যে রাগকে একেবারে দমন করাও সমাধান নয়। কেন রাগ হচ্ছে, তার কারণ খুঁজে দেখা এবং অন্তর্নিহিত সমস্যা চিহ্নিত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবহারিক পরামর্শ ও ভবিষ্যৎ গবেষণা

জারভিকের মতে, রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য সবার থেরাপিস্টের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মোবাইল অ্যাপ বা অনলাইন ভিডিও থেকেও দিকনির্দেশনা পাওয়া সম্ভব। গবেষকরা স্বীকার করেন যে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

তবে বর্তমান প্রমাণ অনুযায়ী, রাগ নিয়ন্ত্রণে শান্তিমূলক কৌশলগুলোই সবচেয়ে কার্যকর বলে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে বারবার রাগ প্রকাশ করতে গিয়ে একই বিষয় নিয়ে ঘুরপাক খাওয়ার পরিবর্তে, শারীরিক উত্তেজনা কমানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।