ফুটবলের বেশ একটা রাশভারী নাম আছে, ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। ফুটবলকে সব সময়ই দেখা হয় শান্তির বার্তাবাহক হিসেবে। কিন্তু এমনও দিন আসে, যখন ফুটবল পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। বলছি, এমনই এক ম্যাচের কথা, যার নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়েছে ‘ব্যাটল অব সান্তিয়াগো’ নামে।
ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপে বিশ্বকাপ
২ জুন, ১৯৬২। চিলি আর ইতালি মুখোমুখি হয়েছিল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের এক ম্যাচে। সেটাকে ম্যাচ না বলে একটা রণক্ষেত্র বললেই বেশি ভালো হয়। কারণ, সেই ম্যাচে ভয়াবহতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে লাল কার্ড আর হলুদ কার্ডের প্রবর্তন করা হয়েছিল এই ম্যাচের সূত্র ধরেই। তবে ম্যাচের প্রেক্ষাপট জানতে ফিরে যেতে হবে বিশ্বকাপের বছর দুই আগে।
বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য যখন স্বাগতিক বাছাই হচ্ছিল, তখন এক অদ্ভুত শর্ত জুড়ে দেয় দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল ফেডারেশন। ১৯৬২ বিশ্বকাপ আমেরিকায় যদি আয়োজন করা না হয়, তবে আমেরিকার কোনো দলই অংশ নেবে না। এর মধ্যে ছিল বিশ্বজয়ী ব্রাজিলের নামও। পেলে তখন নিজের ক্যারিয়ারের তুঙ্গে। ফিফা সেই দাবি মেনে নিল বিনা বাক্য ব্যয়ে। ফলে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেল চিলি। কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনের মাত্র দুই বছর আগে, ১৯৬০ সালের ২২ মে ৯.৪ থেকে ৯.৬ মাত্রার এক ভূমিকম্প আঘাত হানে চিলিতে। প্রায় ১০ মিনিট টানা ভূকম্পন হয়েছিল সেদিন। ধরা হয়, রেকর্ড করা শুরু হওয়ার পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প ছিল সেটি।
সঙ্গে যুক্ত হয় সুনামি। পুরো দেশ মুহূর্তেই পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই ভূমিকম্পে। প্রাণ হারায় প্রায় ছয় হাজার মানুষ। ফিফার চিন্তা ছিল বিশ্বকাপকে কোনোভাবে সরিয়ে আনা যায় কি না। কিন্তু চিলির প্রেসিডেন্ট অনুরোধ করেন ফিফাকে, এই বিশ্বকাপ ছাড়া তাদের আর কিছুই বেঁচে নেই। ফলে অনেক দাবিদাওয়ার মুখে ১৯৬২ সালে মাত্র চার ভেন্যুতেই বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় চিলি।
সাংবাদিকদের বাজে মন্তব্যে আগুন
সেই সময় চিলির প্রস্তুতি দেখতে ভ্রমণে এসেছিলেন ইতালির দুই সাংবাদিক—আন্তোনিও ঘিরেলি ও কোরাডো পিজিনেলি। চিলি ঘুরে গিয়ে পত্রিকায় চিলিকে ‘অনুন্নত’, ‘দরিদ্র’ এবং চিলির নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন তাঁরা। পুরো পৃথিবী যখন চিলির দিকে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন ইতালিয়ানদের এমন মন্তব্যে ফুঁসে ওঠে সবাই। চিলিও পাল্টা জবাব দেয় ইতালিয়ানদের ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘মাফিয়া’ বলে। মাঠের লড়াইয়ের শুরুর আগে দুই দেশের মধ্যে হানাহানির অবস্থা।
রণক্ষেত্রে পরিণত মাঠ
এর মধ্যেই মাঠে গড়ায় ইতালি আর চিলির ম্যাচ। দুই দেশই ক্ষিপ্ত, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। কিন্তু সেই প্রতিশোধ খেলায় নয়, বরং গড়াল হাতাহাতিতে। প্রথম ফাউলটি হয় ম্যাচ শুরু হওয়ার মাত্র ১২ সেকেন্ডের মাথায়। হাতাহাতি করায় ম্যাচের আট মিনিটে বের করে দেওয়া হয় ইতালির জর্জিও ফেরিনিকে। কিন্তু ফেরিনি তো মাঠ ছাড়বেন না। ফলে চিলির পুলিশ মাঠে ঢুকে তাঁকে চ্যাংদোলা করে বেঞ্চে রেখে আসে। বলা বাহুল্য, কার্ড আবিষ্কারের আগে ভয়াবহ কোনো ফাউল হলে রেফারিরা খেলোয়াড়দের কিছুক্ষণের জন্য মাঠের বাইরে পাঠাতে পারতেন।
একটু পরই চিলির তারকা লিওনেল সানচেজ সরাসরি ঘুষি বসিয়ে দেন ইতালি অধিনায়কের নাকে। অধিনায়ক হাম্বার্তো মাসচিও রক্তাক্ত নাক নিয়ে পড়ে থাকেন মাঠে। কিন্তু রেফারি কেন অ্যাস্টন সরাসরি না দেখায় মাঠ থেকে সরালেন না সানচেজকে। একটু পর সানচেজ আবারও থাপ্পড় মারেন ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মারিও ডেভিডকে। এবারও তা চোখ এড়িয়ে যায় রেফারির। ইতালিয়ানরা কি থেমে থাকবে? মারিও ডেভিড সরাসরি এসে লাথি বসিয়ে দিলেন সানচেজের মাথায়। এর ফলশ্রুতিতে মারিও ডেভিডকে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হলো। মাত্র ৩৮ মিনিটের মধ্যে ইতালি পরিণত হয় ৯ জনের দলে।
মোট চারবার পুলিশকে মাঠে নামতে হয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধেও বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি ম্যাচের পরিস্থিতির। মাঠে কিছু হলেই একটু পরপর হাতাহাতি, মারামারি, থুথু নিক্ষেপ তো ছিলই। কাউকে মাঠ ত্যাগ করতে না হলেও প্রতি মিনিটেই বেজে চলছিল ফাউলের বাঁশি। ম্যাচ চলাকালীন মোট চারবার সশস্ত্র পুলিশকে মাঠে নামতে হয়েছিল। রীতিমতো লাঠিচার্জ করে ফুটবলারদের মধ্যকার দাঙ্গা থামাতে হয়েছে তাদের। দর্শকেরাও কম যায়নি, ইতালির খেলোয়াড়েরা যখনই কর্নার বা থ্রো-ইন নিতে যাচ্ছিলেন, গ্যালারি থেকে বৃষ্টির মতো ছোড়া হচ্ছিল পাথর আর কয়লা। গোলরক্ষকে লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছিল বোতল।
৯ জনের ইতালির বিপক্ষে সহজেই ২ গোলের লিড নিয়ে নেয় স্বাগতিক চিলি। অন্যদিকে ৯০ মিনিট পার হতে না হতেই ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজিয়ে দেন রেফারি কেন অ্যাস্টন। তাঁর মতে, সেই ম্যাচে আর এক মিনিটও মাঠে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
ম্যাচের পরিণতি ও কার্ডের জন্ম
এই ম্যাচের প্রভাব পড়েছিল পুরো চিলিতে। বার, রেস্তোরাঁয় নিষিদ্ধ করা হয় ইতালিয়ানদের। পুলিশি নিরাপত্তায় রাখা হয় ইতালিয়ান সমর্থক ও খেলোয়াড়দের। ইতালিতে চিলির রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। সেবার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় ইতালি। ইতালির বিদায়ে স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়েছিলেন অনেকে। অন্তত সহিংসতা তো কমবে। ইতালি শেষ ম্যাচ খেলে সেদিন রাতেই চিলি থেকে বেরিয়ে আসে।
শুধু চিলি ম্যাচ নয়, সেই বিশ্বকাপজুড়েই ছিল আক্রমণাত্মক এক মনোভাব। বিশ্বকাপের প্রথম দুই দিনে মোট চারজন খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেন রেফারিরা। পা ভাঙে তিনজনের। ভাঙা গোড়ালি ও চিড় ধরা বুকের পাঁজর নিয়ে মাঠ ছাড়েন অনেকে। আর্জেন্টিনা-বুলগেরিয়া ম্যাচে রেফারি মোট বাঁশি বাজিয়েছেন ৬৯ বার, প্রতি ৭৮ সেকেন্ডে ১টি ফাউল হয়েছে মাঠে। এমনকি আগের বিশ্বকাপ রাঙানো পেলেও মাত্র এক ম্যাচ খেলেই চোট পেয়ে বেরিয়ে যান বিশ্বকাপ থেকে।
সেই ম্যাচের রেফারি কেন অ্যাস্টন সূচনা করেছিলেন কার্ডের। প্রায় ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়েও ইংলিশ রেফারি কেন অ্যাস্টন কিছু করতে পারেননি সেদিন। ম্যাচ শেষে বলেছিলেন, ‘আমি কোনো ফুটবল ম্যাচ সামলাইনি, মনে হচ্ছিল দুই দেশের যুদ্ধ থামাচ্ছি।’ কিন্তু এর পর থেকেই তাঁর মাথায় খেলে ভিন্ন বুদ্ধি। খেলোয়াড়দের এভাবে আর সামলানো যাবে না, ফলে তাদের সামলাতে হলে সতর্ক করতে হবে। ট্রাফিক লাইট থেকে আসে সেই আইডিয়া। হলুদ মানে সতর্ক আর লাল মানে থামা। ফুটবলেও ঠিক একই গল্প, হলুদ মানে সতর্ক আর লাল মানে বহিষ্কার। যদিও সেই নিয়ম চালু হতে আরও আট বছর লেগেছিল। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচের প্রভাবও ছিল এই নিয়ম চালুর পেছনে। অবশেষে ফিফার রেফারিং কমিটির চেয়ারপারসন হয়ে ১৯৭০ বিশ্বকাপ থেকে হলুদ ও লাল কার্ডের প্রবর্তন করেন রেফারি কেন অ্যাস্টন।



