কারাগারে স্বজনদের যাতায়াত সহজ করতে চালু হলো গলফ কার সেবা
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দীদের স্বজনদের ভোগান্তি কমাতে একটি অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারাগারের মূল ফটক থেকে সাক্ষাৎ কক্ষ পর্যন্ত দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের জন্য চালু করা হয়েছে আধুনিক গলফ কার সেবা। এই সেবা কার্যকর করার মাধ্যমে নারী, শিশু, অসুস্থ ও বয়স্ক দর্শনার্থীদের জন্য যাতায়াতের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব হয়েছে।
ভোগান্তি কমাতে উদ্যোগ
কাশিমপুর কারা কর্তৃপক্ষ বন্দীদের সঙ্গে দেখা করতে আসা স্বজনদের যাতায়াতের অসুবিধা দূর করতে সক্রিয় হয়েছে। কারা কল্যাণ তহবিল থেকে প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে চারটি আধুনিক গলফ কার বা ছোট বৈদ্যুতিক যান চালু করা হয়েছে। এই নতুন সেবার মাধ্যমে কারাগারের মূল ফটক, যা আরপি গেট নামে পরিচিত, থেকে সাক্ষাৎ কক্ষ পর্যন্ত দর্শনার্থীরা দ্রুত ও সহজে পৌঁছাতে পারছেন।
কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সের ভেতরে আলাদা চারটি কারাগার অবস্থিত। প্রতিটি কারাগারের মূল ফটক থেকে সাক্ষাৎ কক্ষের দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। আগে বন্দীর স্বজনেরা এই দীর্ঘ পথ হেঁটে বা রিকশায় যাতায়াত করতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতেন। বিশেষ করে নারী, শিশু, অসুস্থ ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর।
দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা
টাঙ্গাইলের বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী রাহেলা বেগমের ছেলে কাশিমপুর কারাগারে বন্দী। তিনি বলেন, ‘আগে গেট থেকে সাক্ষাৎ কক্ষ পর্যন্ত হেঁটে যেতে খুব কষ্ট হতো। লম্বা পথ হাঁটতে হাঁটতে দম বন্ধ হয়ে আসত। বয়স হয়েছে, আগের মতো হাঁটতে পারি না। গাড়ির ব্যবস্থা করায় খুবই ভালো হয়েছে।’
শিশুসন্তান নিয়ে আসা দর্শনার্থী শারমিন আক্তারও একই রকম অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি বলেন, ‘ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে এত পথ হাঁটা খুব কঠিন ছিল। মাঝেমধ্যে অসুস্থও হয়ে পড়তাম। এখন গাড়িতে নিয়ে যাওয়ায় কষ্ট অনেক কমেছে। নারী ও শিশুদের জন্য এটা খুবই ভালো হয়েছে।’
সেবার বিস্তারিত
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, গত বছরের শেষের দিকে একটি গলফ কার দিয়ে সেবা শুরু করা হয়। এরপর জানুয়ারিতে আরও দুটি কার যুক্ত করা হয় এবং সাত দিন আগে আরেকটি কার যোগ করে মোট চারটি গলফ কার চালু করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে এই চারটি কার দিয়ে পুরোপুরি সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি গলফ কারে ১০ জন যাত্রী বসতে পারেন, যা দর্শনার্থীদের জন্য যথেষ্ট সুবিধাজনক।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এলাকার আবদুল কাদের, যার ছেলে হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দী, তিনি বলেন, ‘আগে হেঁটে যেতাম, এখন গাড়ির ব্যবস্থা করায় খুবই ভালো লাগছে। ফটক থেকে সরাসরি সাক্ষাতের জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কারা কর্তৃপক্ষের মতে, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দর্শনার্থীদের কষ্ট লাঘব করা, সেবা সহজলভ্য করা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারা কল্যাণ তহবিলের অর্থ যথাযথভাবে জনকল্যাণে ব্যবহার করে এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেল সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন আরও বলেন, ‘স্বজনদের কষ্ট লাঘব করার জন্যই আমাদের এই উদ্যোগ। ভবিষ্যতে আরও জনবান্ধব ও মানবিক উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা আছে।’
এই গলফ কার সেবা চালুর ফলে আগে যেখানে দর্শনার্থীরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতেন বা অতিরিক্ত ভাড়া দিতে বাধ্য হতেন, সেখানে এখন নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্ধারিত পয়েন্টে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা রয়েছে। এতে সময় সাশ্রয় হচ্ছে এবং শারীরিক কষ্টও কমেছে। কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সে প্রতিদিন শত শত মানুষ বন্দীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন, এবং এই নতুন সেবা তাদের জন্য একটি বড় রিলিফ হিসেবে কাজ করছে।
