রাজনীতি ও অর্থনীতির ছায়ায় ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের 'বিষাক্ত' রূপান্তর
রাজনীতি ও অর্থনীতির ছায়ায় ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট

রাজনীতি ও অর্থনীতির ছায়ায় ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের 'বিষাক্ত' রূপান্তর

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইক আথারটন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, রাজনৈতিক কারণে ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচ 'বিষাক্ত' হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন 'লোকদেখানো প্রদর্শনীতে' পরিণত হয়েছে, যা বিশুদ্ধ ক্রিকেটের চেতনা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। আথারটনের অভিমত হলো, প্রতিবেশী দুই দেশের এই লড়াই তার পুরোনো আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে এবং বর্তমানে এটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক অবস্থান জানান দেওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ক্রিকেটের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের মিশ্রণ

সম্প্রতি কলম্বোর আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তানের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল। তবে, ম্যাচটি হবে কি হবে না তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ক্রিকেট জগতে যে 'কম্পন' সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে দ্য টাইমসে লেখা একটি কলামে আথারটন তাঁর এই মতামত প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলতে না পারার জেরে পাকিস্তান সরকার ভারতের বিপক্ষে না খেলার ঘোষণা দিয়েছিল। যেহেতু টুর্নামেন্টের আয়ের একটি বিশাল অংশ এই ম্যাচ থেকে আসে, তাই আইসিসি এই ঘোষণায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। লাহোরে গিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যানের আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।

আথারটনের মতে, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে বিশ্ব ক্রিকেট একটি একক ম্যাচের ওপর কতটা বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল। তিনি লিখেছেন, 'পাকিস্তান সরকার যখন ম্যাচটি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিল, তা ক্রিকেট মহলে একটি আর্থিক কম্পন সৃষ্টি করেছিল। তখন দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে: প্রথমত, এই অঞ্চলে খেলাটি কতটা রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ক্রিকেটের অর্থনীতি কতটা ভঙ্গুর, যা একটি ম্যাচের ওপর অসমভাবে নির্ভরশীল।'

'ব্যর্থ হওয়ার পক্ষে বড্ড বেশি বড়' ম্যাচের বাণিজ্যিক চাপ

বর্তমানে বিশ্বকাপে ধারাভাষ্যকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আথারটন মনে করেন, রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও শেষ পর্যন্ত এই ম্যাচটি হওয়াই ছিল অনিবার্য। কারণ হিসেবে তিনি ক্রিকেটের বাণিজ্যিক দিকটিকে দায়ী করেছেন। আথারটন এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে—'আধুনিক ক্রিকেটে অর্থ শুধু কথাই বলে না, রীতিমতো চিৎকার করে। তাই ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচটি আয়োজনের জন্য কোনো না কোনো পথ বের করা সবসময়ই অনিবার্য ছিল। এটি এমন এক লড়াই যা এখন 'ব্যর্থ হওয়ার পক্ষে বড্ড বেশি বড়'।'

খেলার চেয়েও একে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সমালোচনা করে তিনি আরও যোগ করেন, 'এটি এমন এক লড়াই, যা বর্তমান আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ব্যবস্থাকে সচল রাখে। অথচ এটি এখন আকর্ষণহীন খেলায় পরিণত হয়েছে, যা শুধু রাজনৈতিক পয়েন্ট অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।'

মাঠের বাইরে 'লোকদেখানো প্রদর্শনী' এবং গুণগত মানের অবনতি

আইসিসির মধ্যস্থতা এবং পর্দার আড়ালের কূটনীতির পর পিসিবি পিছু হটলেও আথারটন মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, উপমহাদেশে ক্রিকেট কখনোই কেবল একটি খেলা নয়। এতে সরকার প্রধানদের সম্পৃক্ততাকে তিনি নেতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছেন। ম্যাচের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক এই ইংলিশ ওপেনার, 'সত্যি বলতে, ইদানীং এটি একটি বাজে তামাশায় পরিণত হয়েছে। মাঠের ভেতরে লড়াইটা বড্ড বেশি একপেশে হয়ে গেছে। আর মাঠের বাইরে ম্যাচের ফলাফলকে কেবল লোকদেখানো বা প্রদর্শনমূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।'

সাম্প্রতিক সময়ে মাঠে হাত মেলান না ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা, যা এই রাজনৈতিক দূরত্বের আরেকটি প্রমাণ। আথারটনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ক্রিকেট এখন শুধু খেলা নয়, বরং এটি রাজনীতি ও অর্থনীতির একটি জটিল খেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে মাঠের ভেতরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঠের বাইরের কূটনৈতিক চাপের কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।