কুষ্টিয়ায় ঈদে নামাজ নিয়ে সংঘর্ষ: আহত ১৩, হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ
ঈদুল ফিতরের দিন বৈরী আবহাওয়ায় নামাজের স্থান নির্ধারণ নিয়ে বিরোধে সংঘর্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন। আজ শনিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে চর এলঙ্গী আচার্য গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের কয়েকজনকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল ও কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিরা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন।
সংঘর্ষের পটভূমি ও আহতদের তালিকা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গড়াই নদের চরে অবস্থিত চর এলঙ্গী আচার্য গ্রামে প্রায় ৫০০ মানুষের বসবাস। সেখানে একটি জামে মসজিদ ও একটি ঈদগাহ মাঠ রয়েছে। শনিবার সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির কারণে ঈদগাহ কমিটি পূর্বঘোষিত সময় পরিবর্তন করে সাড়ে নয়টায় নামাজের সিদ্ধান্ত নেয়। এ নিয়ে গ্রামবাসী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন।
মন্টু প্রামাণিকের নেতৃত্বে একাংশ মসজিদে নামাজ শুরু করলে, ঈদগাহ কমিটির পক্ষ থেকে আলম, গফুর, শাকিলসহ কয়েকজন প্রতিপক্ষকে ঈদগাহে আসার আহ্বান জানান। এ সময় বাগ্বিতণ্ডার জেরে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন:
- রুবেল হোসেন (৩০)
- গফুর (৪০)
- আলম (৪৫)
- শাকিল (২৫)
- রিপন (২৬)
- সরোয়ার (৪৫)
- আশরাফুল (৩৫)
- শাহিন (৩৫)
- জিয়া (৩৭)
- মুসা (৪৫)
- মন্টু প্রামাণিক (৫৫)
- জুয়েল (২৭)
- ফিরোজা খাতুন (৩৩)
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের অবস্থা
আজ দুপুরে কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বারান্দায় আহত রুবেল, জুয়েল, মন্টু প্রামাণিক ও ফিরোজা খাতুন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের হাতে, মুখে ও মাথায় আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন বিদ্যমান।
আহত রুবেল হোসেন বলেন, "সকালে বৃষ্টি হচ্ছিল। এক পক্ষ বলে মসজিদে নামাজ হবে, আরেক পক্ষ বলে ঈদগাহ মাঠে। এ নিয়ে তর্কাতর্কি করতে করতে মারামারি শুরু হয়ে যায়। মারামারি ঠেকাতে গেলে আমার মাথায় জুয়েল, মন্টু, মুসাসহ ১০-১২ জন কাঠের বাটাম ও বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। চিকিৎসক আমার মাথায় আটটি সেলাই দিয়েছেন।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে তাঁর পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়ে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাঁদের লোকজন ঈদের নামাজ পড়তে পারেননি।
হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ
সংঘর্ষের পর মন্টু প্রামাণিকের পক্ষের কয়েকটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। এলাকাবাসীর দাবি, গ্রামের অন্তত চার ভাগের তিন ভাগ মানুষ এবার ঈদের নামাজ পড়তে পারেননি।
বিকেলে চর এলঙ্গী আচার্য গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। আহত মন্টু প্রামাণিক, জুয়েলসহ কয়েকজনের বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
জুয়েলের ভাবি রোকেয়া খাতুন বলেন, "ঈদের নামাজ পড়া নিয়ে রাস্তায় মারামারি হয়ছিল। আর ওরা এসে আমারে বাড়িতে ভাঙচুর করে লুট করে নিয়ে গেছে।"
স্থানীয় বাসিন্দা ছারা খাতুনও অভিযোগ করেন, "এরশেদ, আলম, সাইফুল এসে আমার ছেলের অটোগাড়ি ও বাড়ি ভেঙে চুরমার করে দিছে। আমরা এর বিচার চাই।"
প্রতিক্রিয়া ও আইনগত পদক্ষেপ
এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সংঘর্ষের কারণে এবার ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়া সম্ভব হয়নি। তিনি বৈরী আবহাওয়া ও সংঘর্ষকে এর জন্য দায়ী করেন।
চর এলঙ্গী আচার্য ঈদগাহ ময়দানের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, গ্রামটিতে প্রায় ৫০০ মানুষের বসবাস এবং সংঘর্ষে বেশির ভাগ মানুষ নামাজ পড়তে পারেননি। তিনি উল্লেখ করেন যে সংঘর্ষ ও হামলার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, ঈদের নামাজের স্থান নির্ধারণ নিয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় গ্রামটিতে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ শান্তি বজায় রাখতে তৎপর রয়েছে।



