ঠোঁট না নেড়ে মনে মনে কেরাত পড়লে কি নামাজ শুদ্ধ হবে?
ঠোঁট না নেড়ে মনে মনে কেরাত পড়লে নামাজের হুকুম

নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক মুসল্লি নামাজের কিছু মৌলিক বিধান সম্পর্কে অবগত নন। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— নামাজে কেরাত কীভাবে পড়তে হবে?

অনেকেই মনে করেন, কুরআনের আয়াত মনে মনে পড়ে নিলেই যথেষ্ট। কেউ কেউ ঠোঁট না নেড়ে শুধু হৃদয়ে কেরাত আবৃত্তি করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এভাবে কেরাত পড়লে কি শরিয়তের দৃষ্টিতে তা কেরাত হিসেবে গণ্য হবে? এতে নামাজ কি শুদ্ধ হবে?

এ প্রশ্নের উত্তর জানা প্রত্যেক মুসল্লির জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ নামাজের শুদ্ধতা নির্ভর করে এর ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতগুলো যথাযথভাবে আদায়ের ওপর।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নামাজে কেরাতের গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা বলেন— فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْآنِ ‘অতএব তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ হয় ততটুকু পাঠ কর।’ (সুরা আল-মুযযাম্মিল: আয়াত ২০) এই আয়াত দ্বারা নামাজে কুরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব প্রমাণিত হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ‘যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহা পাঠ করেনি তার নামাজ হয়নি।’ (বুখারি ৭৫৬, মুসলিম ৩৯৪) এ হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে নামাজে কেরাত একটি মৌলিক বিষয়।

মনে মনে কেরাত পড়লে কি তা কেরাত হিসেবে গণ্য হবে?

ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কেরাত বলতে এমনভাবে উচ্চারণ করাকে বোঝায় যাতে জিহ্বা ও ঠোঁট নড়ে এবং হরফগুলো যথাযথ মাখরাজ থেকে বের হয়। শুধু অন্তরে কল্পনা করা বা মনে মনে আয়াত স্মরণ করা কেরাত নয়।

সুতরাং কেউ যদি নামাজে সুরা ফাতিহা বা অন্য কেরাত সম্পূর্ণ মনে মনে পড়ে, ঠোঁট ও জিহ্বা না নেড়ে, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে সে কেরাত আদায় করেনি।

কেরাত কি মুখে উচ্চারণ করা জরুরি?

হ্যাঁ, নামাজের কেরাত মুখে উচ্চারণ করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا ‘আর তুমি কুরআনকে স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে তিলাওয়াত কর।’ (সুরা আল-মুযযাম্মিল: আয়াত ৪) এ আয়াতে তিলাওয়াত শব্দের অর্থই হলো উচ্চারণ করে পাঠ করা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘জিহ্বা না নেড়ে শুধু অন্তরে কুরআন পাঠ করলে তা কেরাত হিসেবে গণ্য হবে না।’

নামাজে কেরাতের সর্বনিম্ন পরিমাণ কী?

একাকী নামাজ আদায়কারী ও ইমামের জন্য— ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে কেরাত পড়া। সুন্নত ও নফল নামাজের প্রত্যেক রাকাতে কেরাত পড়া। ওয়াজিব হলো সুরা ফাতিহা পাঠ করা এবং সুরা ফাতিহার সঙ্গে কমপক্ষে তিনটি ছোট আয়াত বা একটি বড় আয়াত পড়া।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ثُمَّ اقْرَأْ مَا تَيَسَّرَ مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ ‘এরপর কুরআন থেকে যা সহজ হয় তা পাঠ কর।’ (বুখারি ৭৫৭)

ঠোঁট না নেড়ে কেরাত পড়লে নামাজের হুকুম কী?

যদি ফরজ কেরাত মনে মনে পড়ে তাহলে ফরজ কেরাত আদায় হয়নি। ফলে নামাজ শুদ্ধ হবে না। আর যদি ওয়াজিব কেরাত মনে মনে পড়ে যেমন— সুরা ফাতিহা বা সুরা মিলানো ইত্যাদি, তাহলে সাহু সিজদা ওয়াজিব হবে।

নামাজে কেরাতের আওয়াজ কেমন হওয়া উচিত?

যেসব নামাজে নিচু স্বরে কেরাত পড়তে হয় সেখানে এমনভাবে পড়া উত্তম— যেন নিজে শুনতে পায় কিন্তু পাশের ব্যক্তি না শুনতে পায়। তবে ফকিহগণের মতে, যদি ঠোঁট ও জিহ্বা নড়ে এবং হরফগুলো যথাযথভাবে উচ্চারিত হয়, যদিও নিজে শব্দ স্পষ্টভাবে না শোনে, তবুও কেরাত আদায় হয়ে যাবে।

জোরে ও আস্তে কেরাত পড়ার বিধান

জোরে কেরাতের নামাজ: ইমামের জন্য ফজর, জুমা, দুই ঈদ, তারাবিহ, রমজানের বেতর, মাগরিবের প্রথম দুই রাকাত ও ইশার প্রথম দুই রাকাতে উচ্চস্বরে কেরাত পড়া সুন্নত। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا ‘যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন মনোযোগ দিয়ে শোন এবং নীরব থাক।’ (সুরা আল-আ'রাফ: আয়াত ২০৪) তাই মুক্তাদিরা ইমামের কেরাত মনোযোগ দিয়ে শুনবে।

আস্তে কেরাতের নামাজ: জোহর ও আসরে ইমাম ও একাকী নামাজ আদায়কারী নিচু স্বরে কেরাত পড়বেন। কেউ ভুলে উচ্চস্বরে কেরাত পড়লে সাহু সিজদা দিতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমল

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন— كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَرْفَعُ صَوْتَهُ بِالْقِرَاءَةِ أَحْيَانًا وَيُخْفِيهَا أَحْيَانًا ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো উচ্চস্বরে কিরাত পড়তেন, আবার কখনো নিচু স্বরে পড়তেন।’ (মুসনাদ আহমদ ২৪৯৪১) এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে একাকী তাহাজ্জুদ বা রাতের নামাজে উভয় পদ্ধতির সুযোগ রয়েছে।

এ মাসআলা থেকে আমাদের শিক্ষা

  1. নামাজে কেরাত শুধু মনে মনে পড়া যথেষ্ট নয়।
  2. জিহ্বা ও ঠোঁট নেড়ে কেরাত উচ্চারণ করতে হবে।
  3. সুরা ফাতিহা নামাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
  4. নামাজের শুদ্ধতার জন্য কেরাতের বিধান জানা জরুরি।
  5. রাসুল (সা.)-এর শেখানো পদ্ধতিতেই নামাজ আদায় করতে হবে।
  6. নামাজের ছোট ছোট মাসআলাও গুরুত্বসহকারে শেখা প্রয়োজন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي ‘তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ আদায় করতে দেখেছ, সেভাবেই নামাজ আদায় কর।’ (বুখারি ৬৩১)

নামাজ কেবল কিছু শারীরিক কার্যকলাপের নাম নয়; বরং এটি আল্লাহর সঙ্গে বান্দার গভীরতম সম্পর্কের প্রকাশ। আর এই ইবাদতকে শুদ্ধভাবে আদায় করার জন্য কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা জানা অপরিহার্য। তাই নামাজে কেরাত পড়ার সময় শুধু মনে মনে আয়াত স্মরণ করলেই চলবে না; বরং জিহ্বা ও ঠোঁট নেড়ে যথাযথভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। কারণ শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রকৃত কেরাত সেটিই, যা উচ্চারণের মাধ্যমে আদায় করা হয়। আসুন, আমরা নামাজের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিকের প্রতি যত্নবান হই, নামাজের মাসআলা শিখি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো পদ্ধতিতে সালাত আদায় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। আমিন।