সীতাকুণ্ডে আট বছরের শিশু ধর্ষণ-হত্যাচেষ্টার শিকার: হাসপাতালে মৃত্যু
সীতাকুণ্ডে শিশু ধর্ষণ-হত্যাচেষ্টা: আইসিইউতে মৃত্যু

সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে আট বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে গলায় ছুরিকাঘাতে শ্বাসনালি কাটা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া আট বছরের এক শিশু মারা গেছে। সোমবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন আজ বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

চিকিৎসকদের বর্ণনায় শিশুটির শেষ মুহূর্ত

হাসপাতালের পরিচালক বলেন, 'রবিবার রাতে শিশুটির অপারেশন (অস্ত্রোপচার) হয়েছিল। সোমবার বিকালে ড্রেসিং শেষে তাকে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেলে (ওসিসি) নেওয়া হয়েছিল। রাতে অবস্থার আকস্মিক অবনতি ঘটলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়, সেখানেই তার মৃত্যু হয়।' তিনি আরও উল্লেখ করেন, শিশুটির স্বজনরা দাবি করেছেন তাকে ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এই অভিযোগ নিশ্চিত করতে শিশুটির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পরিবারের করুণ বর্ণনা ও বিচারের দাবি

শিশুটির চাচা জানান, অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা ভাতিজিকে ধর্ষণের পর ছুরি দিয়ে শ্বাসনালি কেটে দেয়। মারাত্মক যন্ত্রণা সহ্য করে শিশুটি পাহাড়ি এলাকা থেকে হেঁটে সড়ক সংস্কারের কাজে থাকা এক্সকাভেটরের চালকের কাছে পৌঁছে বাঁচার আকুতি জানায়। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চাচার ভাষ্যে, 'আমরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারিনি। মৃত্যুর খবরে ভাই-বৌ (শিশুটির বাবা-মা) বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। আমরা এই ঘটনার ন্যায়বিচার চাই।'

তিনি আরও বিস্তারিত জানান, সোমবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় শিশুটির অবস্থা স্থিতিশীল ছিল। সে ইশারায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছিল। রাত আড়াইটার পর থেকে তার অস্বস্তি শুরু হয়, সে পানি ও খাবার চাইছিল। কিন্তু চিকিৎসকদের নিষেধাজ্ঞার কারণে তাকে কিছু দেওয়া সম্ভব হয়নি। রাত সাড়ে তিনটার দিকে তার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং আইসিইউতে মৃত্যু হয়। শিশুটির বাবা একজন টমটম চালক, তাদের বাড়ি সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরা এলাকায়। স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

ঘটনার বিস্তারিত ও উদ্ধার প্রক্রিয়া

শিশুটির চাচার বর্ণনা অনুযায়ী, তাদের বাসা ও তার ভাইয়ের বাড়ির মধ্যে আধা কিলোমিটার দূরত্ব রয়েছে। রবিবার সকালে শিশুটি ঘর থেকে বের হয়, ধারণা করা হয় সে চাচার বাড়িতে আসার জন্যই বেরিয়েছিল। কিন্তু কীভাবে সে পাহাড়ে গেল, তা অজানা রয়ে গেছে।

এর আগে গত রবিবার সকালে সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের ভেতরে অবস্থিত সহস্রধারা ঝরনার প্রায় পাঁচশ মিটার উত্তরে একটি পাহাড়ি পথের ধার থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। সড়ক সংস্কারের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় পেয়ে প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান, পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ওই দিন রাতেই হাসপাতালে শিশুটির গলায় জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। সোমবার তাকে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেলে নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে পরে নাক, কান ও গলা (ইএনটি) ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়, এবং সেখান থেকে আইসিইউতে নেওয়ার পর তার মৃত্যু ঘটে।

চিকিৎসক ও অভিভাবকদের ভাষ্য অনুসারে, শিশুটির শরীরের অভ্যন্তরীণ অংশে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিশেষ করে উরুসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন লক্ষ্য করা গেছে, যা ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার ইঙ্গিত বহন করে।

পুলিশের তদন্ত ও গ্রেফতার

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানান, রবিবার রাতে শিশুটির মা অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে অপহরণ করে হত্যাচেষ্টার মামলা দায়ের করেছিলেন। শিশুটির মৃত্যুর পর এই মামলা এখন হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে। তিনি বলেন, 'ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করা হবে।'

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মো. রাসেল সংবাদমাধ্যমকে জানান, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ইতিমধ্যে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'রাতে একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।' পুলিশের তদন্ত চলমান রয়েছে এবং আরও সন্দেহভাজনদের গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় স্থানীয় সম্প্রদায়ে শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে। শিশুটির পরিবার ও স্থানীয়রা দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন বর্বরতা প্রতিরোধ করা যায়।