নওগাঁর নিয়ামতপুরের এক মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও সংগ্রাম
নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর থানার গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালার শিক্ষার্থী ফাতেমা খাতুনের জীবনের লক্ষ্য স্পষ্ট। 'আমার বাবা-মায়ের ছেলে নেই, তাই তাঁরা খুব দুশ্চিন্তা করে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমি লেখাপড়া শেষ করে একটা ভালো চাকরি করব এবং আমার বাবা-মায়ের মনের কষ্ট দূর করতে চেষ্টা করব'—২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ফাতেমা খাতুনের এই কথাগুলো তার দৃঢ় মনোবল ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দেয়।
আর্থিক সংকট ও পারিবারিক পরিস্থিতি
ফাতেমা খাতুন গুড়িহারী গ্রামের মো. মজিদুল ইসলাম ও মোসা. তহমিনা বেগমের ছোট কন্যা। ফাতেমারা তিন বোন, যাদের মধ্যে সে সর্বকনিষ্ঠ। পারিবারিক জীবনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে যখন দুই বছর আগে ফাতেমার বাবা মজিদুল ইসলাম একটি দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে একটি পা ভেঙে ফেলেন। এই দুর্ঘটনার পর তিনি আর কাজ করতে পারেন না, ফলে পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার মা তহমিনা বেগমের কাঁধে।
ফাতেমার বাবার সামান্য কিছু জমি থাকলেও তা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়। তাই ফাতেমার মা বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালনের মাধ্যমে সংসারের খরচ চালানোর চেষ্টা করেন। তহমিনা বেগম বলেন, 'আমার সংসার চালাতে যতই কষ্ট হোক তবুও আমি আমার মেয়ের পড়ালেখা চালিয়ে যাব। আমার বড় দুই মেয়েকে টাকার অভাবে পড়াতে পারিনি। আমার ছোট মেয়ে ফাতেমার পড়ালেখা করে বড় হওয়ার ইচ্ছা, তাই আমি তার ইচ্ছে পূরণ করব।'
শিক্ষাজীবনে অনন্য নিষ্ঠা
ফাতেমা খাতুন বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী হিসেবে পড়ালেখায় বেশ ভালো ফলাফল করছে। তার শিক্ষাজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো অসাধারণ নিয়মানুবর্তিতা। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত একদিনও স্কুল কামাই করেনি এই মেধাবী শিক্ষার্থী। জীবনের লক্ষ্য পূরণে সে দৃঢ় মনোবল নিয়ে এগিয়ে চলেছে, যা তার শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে প্রশংসার দাবিদার।
শিক্ষকদের প্রত্যাশা ও সমর্থন
গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালার প্রধান শিক্ষক রাজিত দাস ফাতেমা খাতুন সম্পর্কে বলেন, 'ফাতেমা মেধাবী একজন শিক্ষার্থী, সংসারের অভাব অনটনের মধ্যেও সে নিয়মিত স্কুলে আসে এবং তার পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। আমি আশা করছি সে এসএসসিতে খুব ভালো ফলাফল করে স্কুল এবং তার পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে।' প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ফাতেমার মতো আরও অনেক শিক্ষার্থী সুযোগ পাচ্ছে, যারা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ফাতেমা খাতুনের গল্প শুধু একজন শিক্ষার্থীর সংগ্রামই নয়, বরং এটি সমাজের সেই সব তরুণ-তরুণীর প্রতিচ্ছবি যারা নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও শিক্ষার মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার এই সংগ্রাম ও স্বপ্ন নওগাঁর নিয়ামতপুর অঞ্চলের জন্য একটি অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
