যাত্রাবাড়িতে লেগুনা চালক খায়রুল হত্যা: চাঁদাবাজি নাকি সিট বিরোধ?
ঢাকার যাত্রাবাড়ি এলাকায় এক লেগুনা চালককে পিটিয়ে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। নিহত ব্যক্তি নুরে আলম ইসলাম ওরফে খায়রুল (৩৫) নামে পরিচিত ছিলেন। শুক্রবার দুপুর পৌনে ৩টার সময় যাত্রাবাড়ি মাছের আড়ত সংলগ্ন সুফিয়া গার্মেন্টের পাশে এই হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চাঁদাবাজির আধিপত্য বা সিটে যাত্রী উঠানোকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগ ও পুলিশের বক্তব্য
যাত্রাবাড়ি-চিটাগাং রোড সড়কে দৈনিক শতাধিক লেগুনা চলাচল করে। প্রতিটি লেগুনা থেকে নারায়ণগঞ্জ ও ওয়ারি ট্রাফিক পুলিশের নামে মাসিক ১ হাজার টাকা, সিদ্ধিরগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ি থানা পুলিশের নামে ৫০০ টাকা এবং লাইন ম্যানের জন্য ৪০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চাঁদাবাজির আধিপত্যকে কেন্দ্র করে যাত্রাবাড়ি ও চিটাগাং রোড লেগুনা স্ট্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন লেগুনা চালক দাবি করেন, খায়রুল চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। যাত্রাবাড়ি থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ড চাঁদার জন্য নয়, বরং লেগুনায় যাত্রী উঠানোকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, নিহত খায়রুলের সঙ্গে হৃদয় নামের অন্য এক চালকের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ ও মামলা
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, শুক্রবার দুপুর আনুমানিক ২টার সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিটাগাং রোড লেগুনা স্ট্যান্ডে সিরিয়ালের বাইরে হৃদয় নামের লেগুনা চালক জোর করে তার লেগুনায় যাত্রী উঠাতে শুরু করেন। এ সময় খায়রুল আপত্তি জানালে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। হৃদয় খায়রুলকে হুমকি দিয়ে যাত্রাবাড়ি আসতে বলেন এবং লেগুনা চালিয়ে সেখানেই চলে যান।
দুপুর পৌনে ৩টার সময় যাত্রাবাড়ির সুফিয়া গার্মেন্ট সংলগ্ন লেগুনা স্ট্যান্ডে খায়রুল পৌঁছামাত্র হৃদয়ের নেতৃত্বে ইমরান, শাকিল, রায়হান, সোহানসহ ১০ থেকে ১২ জন লোক তাকে বেদমভাবে পিটিয়ে জখম করে। খায়রুলের অবস্থার অবনতি দেখে হামলাকারীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত খায়রুলের গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুর জেলার সখিপুর থানার কাছিকাটা কান্দি গ্রামে। তিনি বর্তমানে মাতুয়াইল মধ্যপাড়ায় আমিনুল ইসলাম হেন্দির বাড়ির তৃতীয় তলায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন। এই ঘটনায় নিহতের বাবা মোয়াল্লেম সর্দার বাদী হয়ে এজাহার নামীয় ৮ জনসহ অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে শনিবার যাত্রাবাড়ি থানায় মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ ইতিমধ্যে এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে এবং অন্যান্য জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে।
পরিবারের বেদনাদায়ক অবস্থা
নিহত খায়রুলের ছোট বোন আছিয়া আক্তার পরিবারের করুণ অবস্থার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, "আমার ভাই আগে মাছের ফিডের ব্যবসা করতেন। দেড় বছর বেকার থাকার পর দেড় মাস ধরে ভাড়ায় লেগুনা চালাতেন। আমার একমাত্র ভাইয়ের উপর ৭-৮ জনের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব ছিল। তার আফোয়ানা আলম নুর নামের ৩ বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচারের দাবি জানাই।"
খায়রুল হত্যার প্রতিবাদে ও বিচারের দাবিতে শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লেগুনা চালকরা যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখেছিলেন। এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং নাগরিক সমাজ থেকে দ্রুত বিচার ও ন্যায়বিচারের দাবি উঠছে।
ওসি মোহাম্মদ রাজু আরও জানান, এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কিনা তা তদন্ত সাপেক্ষে জানা যাবে। পুলিশের তদন্ত চলমান রয়েছে এবং সকল প্রকার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
