ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার: সফলতা ও ব্যর্থতার মিশ্রণ
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় আঠারো মাসের মেয়াদ শেষে রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০০৪ সালের ৮ই আগস্ট ক্ষমতায় আসা এই সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং নির্ধারিত রূপরেখার মধ্যে সংসদ নির্বাচন আয়োজন। সরকারের দাবি অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, তবে বিশ্লেষকরা সফলতা ও ব্যর্থতার মিশ্র চিত্র তুলে ধরছেন।
সরকারের তিনটি মূল এজেন্ডা
সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রসংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক মোট ১১টি কমিশন গঠন করা হয় এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্তত ত্রিশটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে চারটি প্রশ্নে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত কম সময়ে এতটা সংস্কারের উদ্যোগ এর আগে আর কখনো দেখা যায়নি।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলক ভালো করলেও সামাজিক ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হতে পারেনি। ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালে গড়ে ৮.৭৭ শতাংশ ছিল।
বিচার প্রক্রিয়া ও সমালোচনা
বিচারের ক্ষেত্রে সরকার শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দিয়েছে। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে ৮৩৭টি মামলা রেকর্ড হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে। তবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, বিচারের ক্ষেত্রে 'বিচার নাকি প্রতিশোধ' প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সরকার এড়াতে পারতো।
মানবাধিকার ও মব সন্ত্রাস
গত দেড় বছরে মব সন্ত্রাস, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উল্লেখযোগ্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪ মাসে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে ভালুকায় দিপু চন্দ্র হত্যা ও হিন্দু ব্যবসায়ী খুনের ঘটনা।
নির্বাচন ও গণভোট
রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে সরকার ও বিএনপি যৌথভাবে ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগেই নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও হবে। সরকার গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করেছে, তবে 'না' ভোট জয়ী হলে সংস্কার উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা
সরকারের শুরুর দিকে ১৬৭ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল, পরে সরকার এটি ভুল পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করে। সরকারের দাবি, এই ঘটনা ছাড়া সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়নি, বরং প্রেস ফ্রিডমের উন্নতি হয়েছে। তবে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা গণমাধ্যম ভবনে হামলা ও সাংবাদিক আটককে মত প্রকাশের ওপর হামলা হিসেবে দেখছেন।
সরকারের সাফল্য হিসেবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নির্বাচনের দিকে অগ্রগতি এবং সংস্কার কমিশন গঠনকে চিহ্নিত করা হচ্ছে, কিন্তু মব সন্ত্রাস, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সামাজিক অস্থিরতা ব্যর্থতার দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগামী নির্বাচন ও গণভোটই চূড়ান্ত মূল্যায়নের মাপকাঠি হতে পারে।
