ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকায় ৫৫ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ক্যামেরা নজরদারি
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকায় ৫৫ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রে পুলিশ, র‍্যাব ও আনসারের প্রায় ৫৫ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এই বিশাল বাহিনীর মাধ্যমে ভোট চলাকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর বিস্তারিত মোতায়েন

ডিএমপিতে বর্তমানে ৩১ হাজারের কিছু বেশি পুলিশ সদস্য কর্মরত রয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে ২৬ হাজার ৫১৫ জন নির্বাচনী দায়িত্বে থাকবেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি, ২৭ হাজার ৭০৩ জন আনসার সদস্য এবং ৫ শতাধিক র‍্যাব সদস্য মোতায়েন করা হবে। এছাড়াও, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের সদস্যরাও নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন।

ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের জন্য রাজধানীর চারটি স্থানে নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো হলো রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, মিরপুর পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট কার্যালয়, গুলশান কূটনৈতিক বিভাগের কার্যালয় এবং উত্তরা এলাকা। ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগে আটটি উপ-নিয়ন্ত্রণকক্ষও থাকবে, যা সার্বিক তদারকি নিশ্চিত করবে।

ভোটকেন্দ্র শ্রেণিবিভাগ ও নিরাপত্তা কাঠামো

ডিএমপি জানিয়েছে, ২ হাজার ১৩১টি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ‘সাধারণ’—এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৮২৮টি কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ এবং ৩০৩টি সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে চারজন এবং সাধারণ কেন্দ্রে তিনজন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। তবে একটি ভেন্যুতে একাধিক কেন্দ্র থাকলে সেখানে পাঁচজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন।

দায়িত্বরত প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকবে, যা নিরাপত্তা জোরদার করবে। পুলিশের পাশাপাশি, প্রতিটি কেন্দ্রে ১০ জন আনসার সদস্য ও একজন সহকারী সেকশন কমান্ডার অস্ত্রসহ দায়িত্ব পালন করবেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার নিরাপত্তায় থাকবেন একজন সশস্ত্র আনসার সদস্য।

প্রযুক্তিগত নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত

প্রতিটি কেন্দ্রে অন্তত একজন পুলিশ সদস্যের শরীরে দেহে ধারণযোগ্য ক্যামেরা থাকবে, যার মাধ্যমে সরাসরি ভিডিও ধারণ করা হবে। কেন্দ্রের কোনো গোলযোগ বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলে নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও সংশ্লিষ্ট থানা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তা পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

নির্বাচন উপলক্ষে রাজধানীতে ৫৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হবে। এতে নির্বাচন কমিশন নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং ডিএমপিতে কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্ব পালন করবেন। পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করবেন ডিএমপির আইন কর্মকর্তা (জেলা জজ পদমর্যাদা) মোহাম্মদ আতাউল হক।

মোহাম্মদ আতাউল হক বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রে আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা নেবেন।’ তিনি আরও জানান, সড়কে অপ্রীতিকর ঘটনা বা নিয়মিত মামলার বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।

র‍্যাবের ভূমিকা ও সার্বিক সমন্বয়

র‍্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, রাজধানীতে র‍্যাব সদস্যরা টহলে থাকবেন। কোথাও গোলযোগ হলে নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থায় যুক্ত সদস্যরা তা জানতে পারবেন এবং দ্রুত সেখানে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবেন।

ডিএমপির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জাতীয় নির্বাচনে ঢাকার কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে বিদেশি পর্যবেক্ষক ও দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি বেশি থাকে, ফলে নির্বাচনের সার্বিক মূল্যায়নে ঢাকার পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দেশব্যাপী নিরাপত্তা পরিকল্পনা

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্র অনুযায়ী, নির্বাচন উপলক্ষে ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকবে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও কোস্টগার্ড মোতায়েনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও কার্যক্রম) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনী সামগ্রী কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রায় ২৭ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়ে নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এই সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু পরিবেশে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।