অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়: উপদেষ্টাদের পরিকল্পনা ও নির্বাচনের প্রাক্কালে কর্মব্যস্ততা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। দেড় বছর পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে কার্যত এই সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকাল।
বিদায়ের সুর ও শেষ কর্মদিবস
বিদায়ের সুর বেজে গেছে গতকাল মঙ্গলবার থেকেই, যা ছিল জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ কর্মদিবস। এ উপলক্ষে অনেক উপদেষ্টা মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক বিদায়ী অনুষ্ঠান করেছেন, যদিও তাঁরা এখনো দায়িত্বে রয়েছেন। নির্বাচনের আগের দিন আজ বুধবার ছিল সরকারি ছুটি, তাই কেউ বাসায় সময় কাটিয়েছেন, কেউ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, আবার কেউ অফিসেও গেছেন।
উপদেষ্টা পরিষদের গঠন ও বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যসংখ্যা প্রধান উপদেষ্টাসহ ২১ জন। এ ছাড়া উপদেষ্টা পদমর্যাদায় বিশেষ সহকারী, বিশেষ দূত ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিলিয়ে আছেন চারজন। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার চারজন বিশেষ সহকারীও রয়েছেন, যা সরকারের কার্যক্রমে বৈচিত্র্য এনেছে।
প্রধান উপদেষ্টার কর্মব্যস্ততা
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আজও কর্মব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনসের (আনফ্রেল) সাত সদস্যের একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল রোহানা হেট্টিয়ারাচ্ছির নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে। এ ছাড়া যমুনায় আরেকটি বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রতিনিধিদলও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। প্রধান উপদেষ্টা আগামীকাল রাজধানীর গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেবেন বলে জানা গেছে।
উপদেষ্টাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ মুঠোফোনে জানান, আজ তিনি বাসায় ছিলেন এবং আইন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ দুটি ফাইলে সই করেছেন। দায়িত্ব শেষে তিনি আবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবেন, যেখানে উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি কর্মরত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, এবং তিনি কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে মার্চের দিকে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আজ সকালে সংসদ সচিবালয়ে গিয়েছিলেন এবং সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি দেখেছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর উপদেষ্টার দায়িত্ব শেষে তিনি আবার আগের পেশায় অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ফিরে যাবেন এবং মৌলিক বিষয়ে লেখালেখি ও গবেষণা করবেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন আজ সকাল সাড়ে ১০টায় মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গোছানোর পর বাসায় ফিরে বিকেলেও কিছু দাপ্তরিক কাজ করেন। সরকারি দায়িত্ব শেষে তিনি কিছুদিন বিশ্রাম নেবেন এবং এরপর আগের মতোই লেখালেখিতে ফিরতে চান।
খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানান, নির্বাচনের আগের দিন বাসায় বন্ধু-স্বজনেরা দেখা করতে এসেছিলেন। দায়িত্ব শেষে তিনি আগের মতোই সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন, যেখানে উপদেষ্টা হওয়ার আগে তিনি সংবাদপত্রে কলাম লিখতেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান আজ বাসায় ছিলেন এবং ভোট উপলক্ষে রাজধানী ছাড়ার সময় যাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন আছে কি না, সে বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন। বিশেষ করে পদ্মা সেতু, যমুনা সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কে যানজট এড়াতে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। তিনি সরকারি পুলের গাড়ি ফেরত দিচ্ছেন এবং আগের ব্যক্তিগত গাড়ি বিক্রি করেছিলেন। আজ নতুন গাড়ি কেনার বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন। সরকারি দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হবে পবিত্র রমজান মাস, এবং অবসর সময়ে রোজা ও ইবাদতে মনোনিবেশের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। রমজানের পর আবার লেখালেখি ও বই পড়ায় ফিরবেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, ভোটের দিনসহ টানা কয়েক দিন ছুটি থাকায় অনেক উপদেষ্টা মঙ্গলবারই আনুষ্ঠানিক বিদায় নেন। তিনি আজ সকালে বাসায় কাগজপত্র গোছানোর পর রাজধানীর একটি হোটেলে বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন। নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, অনেক শঙ্কা ও অপপ্রচার ছিল, এবং আয়োজনে চ্যালেঞ্জও ছিল। এখন নির্বাচন হচ্ছে এবং তিনি আশা করেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে। দায়িত্ব শেষে তিনি আবার বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) কাজে ফিরবেন।
সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ জানান, মঙ্গলবারই তিনি শেষ অফিস করেছেন। তিনি বলেন, অনেক কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছি বলা যাবে না, তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করেছি এবং কিছু কাজ শুরু করে দিতে পেরেছি। দায়িত্ব শেষে কিছুদিন নিরিবিলি থাকার পরিকল্পনা রয়েছে এই উপদেষ্টার। তিনি জানালেন, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা লিখবেন, পাশাপাশি ব্রতীতে ফিরে যাবেন এবং মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করবেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যুক্ত নারীদের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
