শতবর্ষী অশ্বত্থগাছের নিচে জীবিকার স্পন্দন
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বিল্বগ্রাম হাটে শতবর্ষী অশ্বত্থগাছটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন গ্রামীণ ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী। এর ছায়াতলে টাটকা শাকসবজি, ফলমূল, মাছসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ভাসমান ব্যবসায়ীরা। কাপড়ের শামিয়ানা ও পলিথিনের ছাউনির নিচে গড়ে ওঠা অস্থায়ী দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। সপ্তাহে শনি ও বুধবার বসে এই হাট, যা কেবল বাজার নয়, বরং জীবনের গল্পের এক জীবন্ত মঞ্চ।
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ
বিল্বগ্রাম হাট শুধু গ্রামীণ বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, এখানে ধর্মীয় সম্প্রীতিরও অনবদ্য চিত্র ফুটে উঠেছে। বাজারের পশ্চিম প্রান্তে পাশাপাশি অবস্থান করছে একটি মসজিদ ও একটি কালীমন্দির, যা মানুষের সহাবস্থান ও সম্প্রীতির বার্তা বহন করে। আরও উল্লেখযোগ্য হলো নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে নির্মিত একতলা মার্কেটে নারীরা কসমেটিকস, তৈরি পোশাক, হোমিও চিকিৎসালয় ও বিউটি পারলার মতো ব্যবসা চালাচ্ছেন। মাসে মাত্র ৫০ টাকা ভাড়ায় এই স্থায়ী দোকানগুলো প্রতিদিন খোলা থাকে, যা গ্রামীণ হাটে বিরল দৃশ্য।
গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র
বিল্বগ্রাম হাট এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহজাহান মিয়া (৭৬) বলেন, 'আমার জন্মের পর থেকে এই হাট দেখছি। গৌরনদী এলাকার সবচেয়ে পুরোনো হাটবাজারের মধ্যে এটি অন্যতম।' বিশেষ করে চাষের মাছ ও পান—এই দুটি পণ্য এখানে বিখ্যাত, যা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি হয়। হাটে দুটি বড় ছাউনিতে সামুদ্রিক ও স্থানীয় বিলের তাজা মাছ, যেমন রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, পাঙাশ, তেলাপিয়া, শোল, কই, শিং, মাগুর ইত্যাদির সমারোহ দেখা যায়।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও যোগাযোগ
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশের গৌরনদী উপজেলার অশোককাঠি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার আঁকাবাঁকা সরু পিচঢালা সড়ক ধরে বিল্বগ্রাম হাটে পৌঁছানো যায়। চারপাশে খাল–বিল ও সবুজ ধানখেত পেরিয়ে হঠাৎ করেই চোখে পড়ে এই হাট, যেখানে একটি বড় খোলা মাঠে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অশ্বত্থগাছের নিচের খোলা মাঠজুড়ে স্থানীয় খেত ও বাড়ির আঙিনার ফসল, যেমন লাউ, কুমড়া, শিম, বেগুন, মরিচ, শাকের আঁটি ইত্যাদি বিক্রি হয়, যেখানে বেশির ভাগ বিক্রেতাই নিজের উৎপাদিত পণ্য এনে বিক্রি করেন।
সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা একটি ঐতিহ্য
ভাসমান সবজি বিক্রেতা বেলাল হোসেন বলেন, 'শনি ও বুধবার আমাদের ভাসমান হাট বসে। এটা এই অঞ্চলের পুরোনো বড় বাজার, বেচাবিক্রিও খুব ভালো।' শতবর্ষী এই হাট যেন মানুষের জীবন-জীবিকার গল্পের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। সময় বদলালেও হাটটি তার চিরচেনা ছন্দে গ্রামীণ সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে চলেছে, প্রমাণ করছে যে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা পাশাপাশি সহাবস্থান করতে পারে।



