শরীয়তপুরে তেল সংকটে কৃষকদের বিক্ষোভ, পেট্রোল পাম্প ঘেরাও
শরীয়তপুরে তেল সংকটে কৃষকদের বিক্ষোভ

শরীয়তপুরে তেল সংকটে কৃষকদের বিক্ষোভ, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সমাধান

শরীয়তপুর সদর উপজেলায় তেল সংকটের কারণে কৃষকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। গতকাল শনিবার রাতে দেড় শতাধিক কৃষক শরীয়তপুর–মাদারীপুর সড়কের মনোহর বাজার এলাকায় হাজী আবদুল জলিল ফিলিং স্টেশনের সামনে জড়ো হয়ে পেট্রোল পাম্পটি ঘেরাও করেন। তেল না পাওয়ায় তাঁদের এই বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে, যা পরে সদর উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রণে আসে।

তেল সংকটের পটভূমি ও প্রভাব

স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, শরীয়তপুর জেলায় ছয়টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন বিভিন্ন যানবাহনের জন্য প্রায় ৪০ হাজার লিটার ডিজেল, ১৫ হাজার লিটার পেট্রল এবং ১২ হাজার লিটার অকটেন প্রয়োজন। তবে কয়েক দিন ধরে জেলায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ঈদের পর টানা তিন দিন পাম্পগুলো বন্ধ থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এছাড়াও, জেলার বিভিন্ন হাটবাজার ও নদীতীরবর্তী এলাকায় তেল বিক্রেতারা প্রতি লিটার ডিজেল ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেশি দামে কৃষক ও জেলেদের কাছে বিক্রি করছেন। অনেক স্থানে কৃষক ও জেলেরা তেল পাচ্ছেন না, যার ফলে সেচযন্ত্র ও কৃষিযন্ত্র চালানো ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকটের কারণে বোরো ও রবিশস্য আবাদও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃষকদের বিক্ষোভ ও প্রশাসনের পদক্ষেপ

কৃষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, শরীয়তপুর সদরের মনোহর বাজারের হাজী আবদুল জলিল ফিলিং স্টেশনে টানা চার দিন তেল বিক্রি বন্ধ ছিল। গতকাল বিকেলে বিক্রি শুরু হলে সন্ধ্যার পর কৃষকেরা সেখানে তেল নিতে যান, কিন্তু তাঁদের তেল দেওয়া হচ্ছিল না। এই অবস্থায় দেড় শতাধিক কৃষক পাম্পটি ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং অন্যান্য যানবাহনে তেল বিক্রি বন্ধ করে দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিক্ষোভের খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত হন সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাফিজ এলাহী এবং পালং মডেল থানার পুলিশ। তাঁদের হস্তক্ষেপে প্রত্যেক কৃষককে ৫ লিটার করে ডিজেল দেওয়া হয়। এরপর রাত সাড়ে নয়টার দিকে কৃষকেরা বিক্ষোভ বন্ধ করে পাম্প ছেড়ে চলে যান, এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও চ্যালেঞ্জ

সদর উপজেলার সুবচনী এলাকার কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, 'প্রতিদিন আমার সেচযন্ত্র চালাতে ১০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। সাত দিন ধরে কোথাও ডিজেল পাচ্ছি না। হাটবাজারে খুচরা ডিজেল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাম্পে এলেও পাই না। আমরা ফসলের আবাদ করব কীভাবে? আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে পাম্পে জড়ো হয়েছি।'

হাজী আবদুল জলিল ফিলিং স্টেশনের পরিচালক খালেদ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ব্যাখ্যা করেন, 'বরিশাল ডিপো থেকে চার দিন কোনো তেল সরবরাহ করা হয়নি। তাই পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়েছে। গতকাল বিক্রি শুরু হলে শত শত যানবাহনের ভিড় হয়। আর জেলা প্রশাসন খোলা পাত্রে তেল বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। তাই কয়েকজন কৃষককে খোলা পাত্রে তেল দেওয়া হচ্ছিল না। তখন তাঁরা পাম্প ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। পরে তাঁদের তেল দেওয়া হয়েছে।'

জেলার অর্থনৈতিক প্রভাব

শরীয়তপুর জেলায় অন্তত দেড় লাখ মানুষ কৃষিকাজে যুক্ত, যাঁদের সেচযন্ত্র চালাতে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন। অন্যদিকে, জেলায় ৩৩ হাজার জেলে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত, যাঁদের ব্যবহারের জন্য ১২ হাজার ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। এসব নৌকা চালাতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন। তেল সংকটের কারণে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা স্থানীয় জীবিকা ও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।

সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাফিজ এলাহী বলেন, 'পাম্পে কৃষকেরা বিক্ষোভ করছেন—এমন খবর পেয়ে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সেখানে যাই। পরে প্রত্যেককে পাঁচ লিটার করে ডিজেল দেওয়া হয়েছে। রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত এ সমস্যা ছিল। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।' তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য জ্বালানি তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।