কিশোরগঞ্জে শিলাবৃষ্টিতে কৃষি ক্ষয়ক্ষতি: হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ধ্বংস
কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সম্প্রতি সংঘটিত ভয়াবহ শিলাবৃষ্টির কারণে বোরো ধান ও সবজি খেতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত মঙ্গলবার বিকেল ও রাতে এবং বুধবার বিকেলে তিন দফায় হওয়া এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলার প্রায় ৩,৮৬৪ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পাশাপাশি কয়েক একর সবজি খেতও ধ্বংসের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে ক্ষতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে, যেখানে স্থানীয় কৃষকরা মারাত্মক আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাসমূহ ও পরিসংখ্যান
স্থানীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, হাওর অধ্যুষিত মিঠামইনের ঢাকি, কেওয়ারজোড়, ইটনা, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলাসহ জেলা সদর, পাকুন্দিয়া, হোসেনপুর, কটিয়াদী ও ভৈরবের বিভিন্ন এলাকায় শিলাবৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্থানে শিলার পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে জমি ও সড়ক সাদা হয়ে গিয়েছিল, যা দৃশ্যত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের তীব্রতা নির্দেশ করে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মিঠামইন উপজেলায়, যেখানে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যান্য উপজেলার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিম্নরূপ:
- ইটনায় ৯৮৬ হেক্টর
- অষ্টগ্রামে ১৪০ হেক্টর
- নিকলীতে ১০০ হেক্টর
- পাকুন্দিয়ায় ১২০ হেক্টর
- হোসেনপুরে ১০ হেক্টর
- কুলিয়ারচরে ৬ হেক্টর
- ভৈরবে ২ হেক্টর
কৃষকদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ
মিঠামইনের ঢাকি এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ইব্রাহিম মিয়া ও নাইমুল ইসলামসহ অন্যান্য কৃষকরা জানিয়েছেন, হাওরে শিলাবৃষ্টির কারণে শত শত কৃষকের অনেক জমির কাঁচা-পাকা ধান মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। শিলার আঘাতে ধানগাছ থেঁতলে গেছে, কোথাও কোথাও বোরো ধানের ছড়া ভেঙে গেছে এবং গাছ হেলে পড়েছে। এই পরিস্থিতি অকাল ধান কাটার বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে, যা কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত শ্রম ও খরচের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়াও, হাওরাঞ্চলের অনেক এলাকায় টিনের চাল শিলাবৃষ্টিতে ছিদ্র হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা বসতবাড়িরও ক্ষতি সাধন করেছে। পাকুন্দিয়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে শিলাবৃষ্টিতে সবজি খেতের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে, যা স্থানীয় খাদ্য সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
আবহাওয়া ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
নিকলী আবহাওয়া কার্যালয়ের কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনের মতে, গতকাল রাতে নিকলীতে ১৯ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, পাশাপাশি শিলাবৃষ্টিও সংঘটিত হয়েছে। এই আবহাওয়াগত পরিবর্তন কৃষি ক্ষয়ক্ষতিকে ত্বরান্বিত করেছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান উল্লেখ করেছেন যে, শিলাবৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বোরো ধানের, বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে ক্ষতির মাত্রা বেশি। তিনি আজ দুপুরে হাওরের মিঠামইনের ঢাকিসহ কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকাসহ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে জেলায় শিলাবৃষ্টিতে ৩,৮৬৪ হেক্টর জমির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা গেছে।
এই ঘটনা কিশোরগঞ্জের কৃষি খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে, যেখানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।



