মেঘনায় মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞায় জেলে পরিবারে ঈদের আমেজ নেই
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার আমিরাবাদ এলাকায় আজ শুক্রবার সকালে ঈদের প্রাক্কালেও জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে কোনো উৎসবের আমেজ দেখা যায়নি। প্রায় ২০ দিন ধরে মেঘনায় মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবং সরকারি সাহায্য সীমিত হওয়ায় তারা খাদ্য সংকট ও আর্থিক দুর্দশার মুখোমুখি। জাহাঙ্গীর আলম প্রধান নামের এক জেলে বলেন, 'নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রায় ২০ দিন ধরে মেঘনায় মাছ ধরন বন্ধ। সরকার থেকে সাহায্য পাইতাছি না। অল্পস্বল্প চাউল পাই। শুধু চাউল দিয়া তো আর সংসার চলে না। পরিবার লইয়া খাইয়া না খাইয়া আছি। পেডে ঠিকমতো ভাতই জোডে না। আয়রোজগার নাই। ঈদ করুম ক্যামনে। আমাগো মতো গরিবের লইগা ঈদ-চান নাই।'
আট হাজার জেলে পরিবার বিপাকে
জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাটকা রক্ষায় ১ মার্চ থেকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মেঘনার মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার এলাকায় সব প্রকার মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলার প্রায় আট হাজার জেলে পরিবার এবার ঈদের আনন্দ হারিয়েছে। পরিবার নিয়ে তারা মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন।
মতলব উত্তর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৯ হাজার ১০০ জন, যার মধ্যে মুসলমান জেলে ৫ হাজার। মতলব দক্ষিণ উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে ৫ হাজার ৮১৮ জন, যার মধ্যে মুসলমান জেলে প্রায় ৩ হাজার। দুই উপজেলা মিলে মোট মুসলমান জেলের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার।
জেলে পরিবারে নীরবতা ও হতাশা
আজ শুক্রবার সকালে মতলব উত্তরের মোহনপুর, এখলাশপুর, আমিরাবাদ, বেলতলী ও ষাটনল এবং মতলব দক্ষিণের বাইশপুর ও কাজিরবাজার এলাকায় দেখা গেছে, সেখানকার মুসলমান জেলে পরিবারে ঈদের কোনো আমেজ নেই। পরিবারের সদস্যরা মনমরা হয়ে আছেন, বাড়িগুলো নীরব-নিস্তব্ধ। কাল শনিবার ঈদ হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ জেলের পরিবারে উৎসবের কোনো লক্ষণ নেই। শিশুদের মধ্যেও প্রাণচাঞ্চল্যের অভাব দেখা যাচ্ছে।
মতলব উত্তরের বেলতলী এলাকার মো. জাহাঙ্গীর বলেন, তাঁর পরিবারে ৯ জন সদস্য রয়েছেন। মেঘনায় মাছ ধরা নিষেধ থাকায় ২০ দিন ধরে তারা পরিবার নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। বিকল্প আয়ের কোনো উপায় নেই। মৎস্য অফিস থেকে মাসে ৩০ কেজি করে চাল পাচ্ছেন, যা সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। চাল ছাড়াও অন্যান্য জিনিস কেনার প্রয়োজন হয়, কিন্তু টাকার অভাবে সেগুলো কেনা সম্ভব হচ্ছে না। রাত পোহালে ঈদ হলেও টাকার অভাবে এবার ঈদের কেনাকাটাও হয়নি। বাচ্চাদের নতুন জামা কিনে দিতে না পারায় ঈদের আনন্দই মাটি হয়ে গেছে।
জেলেদের কষ্ট ও হতাশার গল্প
মো. জাহাঙ্গীরের মতো একই রকম কষ্ট ও হতাশার কথা জানিয়েছেন মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল এলাকার জেলে মো. শরিফ, মেহেদী হাসান, মোহনপুরের কাউসার মিয়া, আরিফসহ আরও কয়েকটি এলাকার কয়েকজন জেলে। তারা সবাই সরকারি সাহায্যের অপ্রতুলতা এবং আয় রোজগার না থাকার কারণে ঈদ উদযাপনে ব্যর্থ হচ্ছেন।
মৎস্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য
মতলব উত্তর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাস এবং মতলব দক্ষিণ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শামীম আহামেদ বলেন, জাটকা রক্ষার কর্মসূচির আওতায় ভিজিএফের চাল জেলেরা পাচ্ছেন। তবে বরাদ্দ কম আসায় অনেক জেলে খাদ্যসহায়তা পাচ্ছেন না। মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বরাদ্দও পাওয়া যায়নি, যার কারণে জেলেদের আর্থিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তারা ঈদও ঠিকমতো করতে পারছেন না।
এই সংকট জেলেদের জীবন ও জীবিকাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে, এবং ঈদের মতো উৎসবের সময়েও তাদের দুর্দশা আরও প্রকট হয়ে উঠছে। সরকারি পর্যায় থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই অবস্থার উন্নতি হওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।



