পাবনার বেড়ায় নদীর পানি বিক্রি করে জীবিকা: যমুনা-হুরাসাগরের ভরসায় বহু পরিবার
একসময় পানীয়, রান্না ও দৈনন্দিন কাজে নদীর পানির ওপরই নির্ভর করত মানুষ। সময়ের সঙ্গে শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও দূষণের কারণে সেই চিত্র বদলে গেলেও নদী এখনো বহু মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস হিসেবে টিকে আছে। পাবনার বেড়া উপজেলায় দেখা গেছে এমনই এক ব্যতিক্রমী চিত্র—যমুনা ও হুরাসাগর নদীর পানি সংগ্রহ করে বিক্রি করেই চলছে অনেক পরিবারের সংসার।
ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় পানি সংগ্রহ
বেড়া উপজেলার বেড়া বাজার, মোহনগঞ্জ, হাটুরিয়া ও নাকালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় একদল মানুষ ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীতে নেমে পরিষ্কার পানি সংগ্রহ করেন। পরে বড় ড্রাম ও প্লাস্টিক পাত্রে ভরে ভ্যানযোগে তা সরবরাহ করা হয় দোকান, হোটেল, চায়ের স্টল, ক্ষুদ্র কারখানা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। মোহনগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আমানত আলী (৫০) এ পেশার পরিচিত মুখ। প্রতিদিন ভোরে যমুনা নদী থেকে পানি তুলে তিনি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন। একই পেশায় যুক্ত আছেন আরও অনেকে, যারা নদীর পানিকেই জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
চায়ের দোকান থেকে হোটেল: নদীর পানির চাহিদা
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, চায়ের দোকান, হোটেল, বেকারি ও মিষ্টির কারখানায় নদীর পানির চাহিদা বেশি। মোহনগঞ্জ বাজারের চায়ের দোকানদার মোকবুল হোসেন বলেন, ‘টিউবওয়েলের পানিতে অনেক সময় লোহা বেশি থাকায় চায়ের স্বাদ ও রং ঠিক থাকে না। নদীর পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করলে চা ভালো হয়।’ হোটেল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভাত রান্না, ডাল সিদ্ধ, সবজি ধোয়া ও মাছ-মাংস পরিষ্কারে নদীর পানি ব্যবহার করা হয়। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পানি ফুটিয়ে নেওয়া হয় স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে।
পানি বিক্রেতাদের আয় ও সংসার চালানো
পানি বিক্রেতারা জানান, প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হয় তাদের। মাসে আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। এই আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলে পরিবারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসা। বেড়া বাজারের পানি বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ৮-১০টি দোকানে পানি সরবরাহ করি। এই আয়েই সংসার চলে। অন্য কোনো কাজ না থাকায় এই পেশায় এসেছি।’
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সতর্কতা
তবে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তাহমিনা সুলতানা বলেন, অপরিশোধিত নদীর পানিতে জীবাণু ও রাসায়নিক দূষণ থাকতে পারে, যা ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগের কারণ হতে পারে। তাই পানি ফুটিয়ে ব্যবহার এবং নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা জরুরি।
সব মিলিয়ে বেড়ার এসব মানুষের কাছে যমুনা ও হুরাসাগর শুধু নদী নয়—এটাই তাদের জীবিকার ভরসা, টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতীক। এই পেশা স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যদিও স্বাস্থ্যগত দিক থেকে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।



