কৃষকদের জন্য ডিজিটাল বিপ্লব: পহেলা বৈশাখে শুরু হচ্ছে কৃষক কার্ড বিতরণ
দেশের কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সঙ্গে জড়িত ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য আসছে কৃষক কার্ড বা স্মার্ট ফার্মার্স কার্ড। এই কার্ডটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ডের মতোই কাজ করবে, যার মাধ্যমে সরকারি ভর্তুকি, বীজ, সার ও ঋণের সুবিধা সরাসরি পাওয়া যাবে। একইসঙ্গে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতি কেনা এবং বিমা সুবিধাও পাওয়া যাবে, যা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রথম দফায় ১১ উপজেলার ২২ হাজার কৃষক
প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে ১১টি উপজেলার ২২ হাজার কৃষক পাচ্ছেন এই কার্ড। আগামী ১ বৈশাখ বাংলা নববর্ষের দিনে, অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্ড বিতরণ উদ্বোধন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর দফতর ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে মাঠ পর্যায়ে প্রকৃত কৃষক শনাক্তের কাজ শুরু করেছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। স্থানীয় বিএনপি নেতারা প্রশাসনকে সহায়তা করছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যেই উপজেলা কৃষি অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে স্থানীয় কৃষকদের নামের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষি কর্মকর্তা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সমন্বিতভাবে তালিকা তৈরির কাজ করছেন। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা কাজের সমন্বয় করছেন।
সরকারি সহায়তা ও ডিজিটাল সুবিধা
সরকারের পক্ষ থেকে ভূমিহীন ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা এই কার্ডধারীরাই পাবেন। কার্ডধারীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও অন্যান্য ব্যাংকিং সুবিধা পাবেন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ফসলের রোগবালাই, আবহাওয়ার আপডেট এবং তাৎক্ষণিক বিশেষজ্ঞ পরামর্শও পাওয়া যাবে। কার্ডধারী একজন কৃষককে তার উৎপাদিত পণ্য সঠিক মূল্যে বিক্রির সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। এটি কৃষকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে সরকারি সহায়তা সরাসরি প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছাবে।
কৃষক কার্ড একটি ডিজিটাল কার্ড হওয়ায় এটি ব্যবহার করে এটিএম থেকে সরাসরি টাকা তোলা ও লেনদেন করা সম্ভব হবে। কার্ডধারী প্রকৃত কৃষকরা সরকারি বিশেষ কৃষি ঋণের আওতায় কম সুদে বা বিনা সুদে ঋণ পাওয়ার অগ্রাধিকার পাবেন।
পাইলটিং কার্যক্রম ও বিস্তৃতি পরিকল্পনা
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় আনতে প্রাথমিকভাবে ৮টি বিভাগের ৯ উপজেলায় এই কার্ড বিতরণের পাইলটিং কার্যক্রম শুরু করছে। পরবর্তীকালে ধাপে ধাপে এটি সারা দেশে বিস্তৃত হবে।
শুরুতেই পরীক্ষামূলকভাবে পাইলট কর্মসূচির আওতায় নিম্নলিখিত উপজেলার কৃষকরা এই কার্ড পাবেন:
- টাঙ্গাইল সদর
- পঞ্চগড় সদর ও বোদা
- বগুড়ার শিবগঞ্জ
- ঝিনাইদহের শৈলকুপা
- পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি
- কক্সবাজারের টেকনাফ
- কুমিল্লার আদর্শ সদর
- জামালপুরের ইসলামপুর
- রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ
- মৌলভীবাজারের জুড়ী
প্রধানমন্ত্রীর দফতর সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রাক-পাইলট পর্যায়ের কার্যক্রমের আওতায় আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে নির্বাচিত এলাকাগুলোর সব শ্রেণির কৃষকের তথ্য সংগ্রহ সম্পন্ন করা হবে।
প্রাক-পাইলট পর্যায়ের এই তথ্য সংগ্রহের পর ৯টি উপজেলার ৯টি নির্দিষ্ট ব্লকে এই কার্ড বিতরণ শুরু হবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের সব উপজেলায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
কার্ড পাওয়ার শর্ত ও কমিটি গঠন
কৃষি কার্ড পেতে সাধারণত জাতীয় পরিচয়পত্র, জমির খতিয়ান বা পর্চা এবং সচল একটি মোবাইল নম্বর প্রয়োজন হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভাড়াটে বা বর্গা চাষিরাও এই কার্ড পাবেন। সরকার ‘সব শ্রেণির কৃষক’ শব্দটির মাধ্যমে প্রকৃত চাষি ও বর্গা চাষিদেরও এই কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ন্যূনতম ৯ সদস্যের কে এস সি কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে, যা উচ্চপর্যায়ের তদারকি ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। জাতীয় পর্যায়ে এই কমিটির সভাপতি হবেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ)। কমিটিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিচালক (সরেজমিন উইং) সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালককে সদস্য সচিব করে ৬ সদস্যের কে এস সি (কৃষক স্মার্ট কার্ড) কমিটি গঠন করা হবে। একইভাবে উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কে সভাপতি করে এবং উপজেলা কৃষি অফিসার কে সদস্য সচিব করে নয় সদস্যের উপজেলা কে এস সি কমিটি গঠন করা হবে।
কৃষিমন্ত্রী ও কৃষকদের প্রতিক্রিয়া
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেন, ‘‘আমরা আশা করছি, পয়লা বৈশাখের মধ্যেই কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু করতে পারবো। এই কার্ডের মাধ্যমে একজন কৃষককে ফ্যামিলি কার্ডের মতো কিছু সুবিধা দেওয়া হবে।’’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘উৎপাদন, ভোক্তা, কৃষিজমি, কৃষিপণ্য, ভ্যারাইটি সবকিছু যেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে কৃষক পেতে পারেন এবং সরকারের কাছে যেন সব তথ্য সঠিকভাবে আসে।’’
পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া গ্রামের কৃষক আসলাম উদ্দিন বলেন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওয়ার্ডের মেম্বর এসেছিলেন, তিনি সব তথ্য নিয়ে গেছেন। তিনি জানান, প্রথম দফায় তারা এই কার্ড পাবেন না। তবে ভবিষ্যতের জন্য কাজ এগিয়ে রাখার জন্য এলাকার প্রকৃত কৃষকদের নাম তালিকাভুক্ত করে রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে একই জেলার নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের কৃষক এম এ আয়েকউদ্দিন মিয়া বলেন, পাইলট কর্মসূচিতে নেছারাবাদ উপজেলা আছে। আগামী পহেলা বৈশাখের দিন কৃষক কার্ড বিতরণ করা হবে। তাদের নাম তালিকা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার কৃষকদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি দেশের কৃষি খাতকে ডিজিটালাইজেশনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।



