সুনামগঞ্জের হাওরে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় কৃষকদের ফসল নিয়ে আতঙ্ক
সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাওর এলাকায় গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি, ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা তাদের বোরো ধানের ফসল নিয়ে গভীর চিন্তা ও আতঙ্কে রয়েছেন। অনেকেরই পরিবারের জীবিকা ও সন্তানদের শিক্ষার খরচ এই ফসলের উপর নির্ভরশীল, যা এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
কৃষকদের উদ্বেগ ও ক্ষয়ক্ষতি
শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের কৃষক মনির উদ্দিন (৫২) চার একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। তিনি জানান, প্রথম দিকের হালকা বৃষ্টি ফসলের জন্য উপকারী ছিল, কিন্তু পরে অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে হাওরে পানি জমে গেছে এবং ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, "এখন যদি আরও বৃষ্টি হয় বা বন্যা দেখা দেয়, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।" শুধু মনির উদ্দিন নন, সদর উপজেলার দেখার হাওরপারের ফতেপুর গ্রামসহ জেলার বিভিন্ন হাওরের কৃষকরাও একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
লালপুর গ্রামের কৃষক আবদুন নূর (৬০) পাঁচ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, "সব হাওরেই জলাবদ্ধতা আছে। যদি আরও বৃষ্টি হয়, তাহলে ক্ষতি বাড়বে। এখন বন্যার ভয়ে আমরা আতঙ্কিত।" কৃষক শামস উদ্দিন (৫০) যোগ করেন যে জমে থাকা ঠান্ডা পানি দীর্ঘদিন থাকলে ধানগাছের গোড়া পচে যেতে পারে, আর শিলাবৃষ্টির পুরো ক্ষতি কয়েক দিন পরেই স্পষ্ট হবে।
হাওরগুলোর অবস্থা ও পানিনিষ্কাশনের চেষ্টা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার জোয়ারভাঙা হাওর ও কানলার হাওর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার খাই হাওর ও পাখিমারা হাওর, শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওর, জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওর, তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে কমবেশি জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। জোয়ারভাঙা হাওরে পানিনিষ্কাশনের জন্য কৃষকরা একটি বাঁধের কিছু অংশ কেটে দিয়েছেন, কিন্তু অনেকে পাহাড়ি ঢল ও অকালবন্যার আশঙ্কায় বাঁধ কাটতে ভয় পাচ্ছেন।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, হাওরে বাঁধের কাজ সন্তোষজনক হয়নি এবং বৃষ্টিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, ফসলের ক্ষতি হলে এর দায় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নিতে হবে। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক যোগ করেন যে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজের নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি, কিন্তু এখনো কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, যা জলাবদ্ধতার একটি কারণ।
প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া ও পূর্বাভাস
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, সুনামগঞ্জে এবার দুই লাখ ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, এবং প্রাথমিক হিসাবে ৩৭০ হেক্টর জমি শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, যেসব হাওরে পানিনিষ্কাশনের সুযোগ আছে, সেটি করে দেওয়া হবে, এবং বৃষ্টি থেমে রোদ উঠলে পানি স্বাভাবিকভাবে নেমে যাবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ কাজ চলছে, কিন্তু তা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, "আগামী এক সপ্তাহ হালকা ও মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে, তবে ভারী বৃষ্টি কম হবে। আমরা বাঁধগুলো পর্যবেক্ষণে রাখছি এবং সমস্যা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি। স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকতে হবে।"
এই পরিস্থিতিতে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা তাদের ফসল রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন, যাতে অনাগত বন্যা ও অতিবৃষ্টির হাত থেকে তাদের জীবিকা নিরাপদ থাকে।



