শহুরে শিশুর গ্রামের প্রথম ঈদ: মোবাইলের বাইরের আনন্দ আবিষ্কার
মাসুক হেলাল রিহানা জানালার পাশে বসে বিরক্ত মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। শহরের ফ্ল্যাটে ওয়াই-ফাই, ট্যাবলেট এবং এসিতে অভ্যস্ত এই ১০ বছর বয়সী শিশুর কাছে গ্রামের পথে যাত্রা একঘেয়েমির নামান্তর মনে হচ্ছিল। সবুজ ধানখেত, প্রশস্ত পুকুর এবং মেঠোপথ— এসব কিছুই তাকে উৎসাহিত করতে পারছিল না। বরং তার মনে হচ্ছিল এই ঈদের ছুটিটি সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যাবে।
শুরুতে বিরক্তি এবং অনিচ্ছা
'আম্মু, আমরা কখন ফিরব?' রিহানা বারবার জানতে চাইছিল। তার মা সালমা বেগম বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলেন, 'এখনো তো পৌঁছাইনি ঠিকভাবে, আর ফেরার কথা শুরু করেছিস?' বাবা জাহিদ হাসতে হাসতে বললেন, 'দেখবি, একদিন পরেই তুই আর ফিরতে চাইবি না।' রিহানা বিরক্তিতে চোখ ঘুরিয়ে নিল। গ্রামের বাড়ির কথা ভেবেই তার গা গুলিয়ে উঠছিল— যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল, টিভিতে সীমিত চ্যানেল এবং মশার উপদ্রব।
গাড়ি যখন সরু মেঠোপথ ধরে এগোচ্ছিল, বিকেলের সোনালি রোদ ধানের শীষে লুটোপুটি খাচ্ছিল। দূরের পুকুরপাড়ে কয়েকটি ছেলে মাছ ধরছিল দেখে রিহানা এক পলক তাকাল, কিন্তু তারপর আবার মোবাইলের দিকে মনোযোগ দিল। বারবার 'নো নেটওয়ার্ক' দেখে সে শেষ পর্যন্ত জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ঠিক করল, এই ঈদ হবে তার জীবনের সবচেয়ে বিরক্তিকর ঈদ।
গ্রামে পৌঁছানো এবং প্রথম অভিজ্ঞতা
গ্রামের বাড়ি পৌঁছে প্রথমেই নাকে এল ধুলো এবং গরু-ছাগলের স্বতন্ত্র গন্ধ। উঠোনে হাঁস-মুরগি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পুরোনো টিনের চালা, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা দাদি এবং সেই চিরচেনা আমগাছ— সবকিছুই যেন পুরোনো দিনের গল্প বলছিল। রিহানার মায়ের চোখ ছলছল করে উঠল যখন তিনি দাদিকে জড়িয়ে ধরলেন।
দাদি রিহানাকে ডেকে এনে জড়িয়ে ধরে টাকার নোট গুঁজে দিলেন হাতে। রিহানা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। বাড়িতে ঢুকে সে লক্ষ করল সোফা বা ডাইনিং টেবিলের বদলে মাটিতে পাটি বিছানো আছে। ফ্যান ধীরে ধীরে ঘুরছিল। মোবাইলে নেটওয়ার্ক মাত্র এক দাগ দেখে তার জগৎটা যেন ভেঙে পড়ল।
ঈদের প্রস্তুতি এবং পরিবর্তন
পরদিন সকালে ফজরের আজানের শব্দে রিহানার ঘুম ভাঙল। দাদি তাকে সাহ্রি খেতে ডাকলেন। শহরে যেখানে কেউ সাহ্রি খেতে ওঠে না, সেখানে গ্রামে সবাই নিয়ম মেনে চলছিল। সাহ্রির টেবিলে দাদির হাতে বানানো পরোটা, আলুর দম, খিচুড়ি এবং ডিম ভুনা ছিল। রিহানা অবাক হয়ে দেখল চাচাতো ভাই-বোনেরা কেউ মোবাইল নিয়ে বসেনি— সবাই মিলে গল্প করছিল এবং হাসছিল।
দাদি রিহানাকে ফিরনি বানানো শিখালেন। দুধ জাল দেওয়া, চালের গুঁড়া মেশানো এবং এলাচদানা ফোটানোর প্রতিটি কাজে রিহানা এত মজা পেল যে সময় কাটার খেয়ালই হলো না। দুপুরে চাচাতো ভাই-বোনেরা তাকে নিয়ে মাঠে গেল। সাতচাড়া খেলতে গিয়ে রিহানা প্রথমে পারছিল না, কিন্তু ধীরে ধীরে শিখে ফেলল। দৌড়ানো, লুকানো এবং চিৎকার করে ডাকা— এমন মজার খেলা সে শহরের কোনো পার্কে কখনো খেলে নি।
ঈদের দিনের বিশেষ মুহূর্ত
ঈদের দিন সকালে ফজরের নামাজের পর সবাই নতুন জামা পরে বের হলো। দাদি রিহানার হাতে একটি সুন্দর চুড়ি পরিয়ে দিলেন— পুরোনো দিনের গহনা যা দাদির মায়ের দেওয়া। কোলাকুলি করে সবাই সালাম বিনিময় করল। গ্রামের মাঠে জামাতে দাঁড়িয়ে রিহানা প্রথমবারের মতো এমন নামাজ পড়ল যেখানে পুরো গ্রামের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে।
নামাজ শেষে অচেনা মানুষও হেসে সালাম দিচ্ছিল। বাড়ি ফিরে দাদির হাতে বানানো সেমাই, ফিরনি, লুচি, হালুয়া এবং জর্দা খেয়ে সবাই মিলে আড্ডা দিল। দাদি ছেলেবেলার গল্প বললেন— কীভাবে তারা তিন মাইল হেঁটে ঈদের নামাজ পড়তে যেত এবং নতুন জামার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করত।
মেলা এবং শেষ বিদায়
বিকেলে গ্রামের মাঠের মেলায় নাগরদোলা, পুতুল নাচ এবং মিষ্টির দোকান ঘুরে দেখল রিহানা। ফিরে এসে সবাই মিলে ঘুড়ি ওড়াল। রাতে শোয়ার সময় দাদির পাশে শুয়ে রিহানা শুনল কীভাবে আগের দিনগুলোতে ঈদ মানে ছিল অপেক্ষার দিন। রিহানা মৃদু গলায় বলল, 'দাদি, আমার কাছে এই ঈদটা সবচেয়ে আনন্দের ছিল।'
পরদিন ফেরার সময় দাদির কাছে জড়িয়ে ধরে রিহানা কেঁদে ফেলল, 'দাদি, আমি যাব না। আমি এখানেই থাকব।' দাদির চোখেও পানি জমল। গাড়ি ছেড়ে দিলে রিহানা পিছন ফিরে তাকাল— দাদি তখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছেন।
শিক্ষা এবং পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি
শহরের ফ্ল্যাটে ফিরে রিহানা এখন প্রতিদিন দাদিকে ফোন করে এবং পরবর্তী ঈদের অপেক্ষায় থাকে। যখন কেউ জিজ্ঞেস করে ঈদ কেমন কাটল, সে গর্ব করে বলে, 'আমার জীবনের সেরা ঈদ! গ্রামের বাড়িতে।' রিহানা প্রথমবারের মতো বুঝতে পেরেছিল যে ঈদ মানে শুধু নতুন জামা বা মিষ্টি খাওয়া নয়— ঈদ মানে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে থাকা, ভালোবাসা বিনিময় করা এবং সেই ভালোবাসায় নিজেকে স্নিগ্ধ করে তোলা।
গ্রামের সেই প্রথম ঈদ তাকে শিখিয়েছিল যে প্রকৃত আনন্দ কখনো মোবাইল বা ট্যাবলেটে লুকানো নেই। আনন্দ আছে মানুষের মধ্যে, আছে আপনজনের সান্নিধ্যে এবং আছে মাটির কাছাকাছি। এই অভিজ্ঞতা রিহানাকে একটি মূল্যবান শিক্ষা দিয়েছে— প্রযুক্তির যুগেও মানবিক সম্পর্ক এবং প্রকৃতির সংস্পর্শে আসল সুখ খুঁজে পাওয়া যায়।



