রাজশাহীতে বসন্তের আগমন জানাচ্ছে আগুনরাঙা পলাশ ফুলের সমারোহ
রাজশাহী নগরের সড়কের দুই ধারে টুকটুকে পলাশ ফুল ফুটে প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। মঙ্গলবার নগরের মধ্য বুধপাড়া এলাকায় দেখা গেছে, রাস্তার দুই পাশে দ্যুতি ছড়াচ্ছে লালচে কমলা রঙের পলাশ ফুল, যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় গাছের শাখায় যেন আগুন জ্বলছে। বসন্তের হাওয়া লাগতেই এই ফুলের সমারোহে সাজছে শহর, যা এখন বসন্তের ভরা মৌসুমের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ঋতুভেদে সাজে রাজশাহীর সাত কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক
রাজশাহী নগরের আলিফ-লাম-মীম ভাটা থেকে চৌদ্দপাই বিহাস পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে একেক রূপে সজ্জিত হয়। গ্রীষ্মে সোনালু, বর্ষায় জারুল, শীতে কাঞ্চন আর বসন্তে পলাশ ফুলে সেজে ওঠে এই পথ, প্রতিটি ঋতু এখানে আলাদা সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয়। নগরের কোলাহলের মাঝেও প্রকৃতি নিজস্ব ছন্দে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, সড়কের মাঝের আইল্যান্ডজুড়ে পাম, রঙ্গন ও কাঠগোলাপের সারি বছরজুড়েই পথিকের মন ভরিয়ে রাখে।
পলাশ ফুলের বৈচিত্র্যময় রূপ ও ফোটার সময়
পলাশ ফুল সাধারণত হলুদ, লাল ও লালচে কমলা—এই তিন রঙে দেখা যায়, তবে লালচে কমলার আগুনরাঙা রূপই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে গাছ ভরে ওঠে ফুলে, আর ফুল ফোটার সময় গাছ প্রায় পাতাশূন্য থাকে, যা এর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। সড়কটির দায়রাপাক মোড় থেকে মধ্য বুধপাড়া পর্যন্ত দুই পাশে সারি সারি পলাশগাছ রয়েছে, যা বছরজুড়ে সবুজ পাতায় ঢাকা থাকলেও বসন্ত এলেই পাতার সবুজ ছাপিয়ে ফুটে ওঠে আগুনরাঙা ফুল।
পথিক ও বাসিন্দাদের মুগ্ধতা
এই দৃশ্য দেখে হঠাৎ থমকে যান পথিক, কেউ কেউ মুঠোফোনে বন্দী করেন মুহূর্তটি, কেউবা সকালবেলায় ঝরে পড়া ফুল কুড়িয়ে নেন। রোদের তেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পলাশের রং আরও গাঢ় হয়ে ওঠে, দূর থেকে তাকালে মনে হয় সবুজের ভেতর জ্বলছে আগুনের লাল শিখা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কবির হোসেন বলেন, "শহরের অন্য সড়কগুলোর চেয়ে এই সড়কের আলাদা একটা বিশেষত্ব আছে, এখানে সব সময়ই কোনো না কোনো ফুল ফুটে থাকে। এখন বসন্তে পলাশ ফুটেছে, গাছের নিচে লাল ফুল বিছিয়ে আছে, দেখলে মন ভালো হয়ে যায়।"
সিটি করপোরেশনের পরিকল্পিত উদ্যোগ
রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে পরিকল্পিতভাবে এই সড়কের দুই পাশে প্রায় ১০ হাজার গাছ রোপণ করা হয়, প্রতি কিলোমিটারে ভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ লাগানো হয়েছে। আইল্যান্ডজুড়ে রোপণ করা হয়েছে শোভাবর্ধক বৃক্ষ, এবং বর্তমানে সব গাছই টিকে আছে ও সমানভাবে বেড়েছে। ফলে বছরজুড়ে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বদলে যায় এই সড়কের রূপ, যা নগরবাসী ও দর্শনার্থীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা
সড়কটির পাশেই বসবাসকারী মনির হোসেন বলেন, "ছয়-সাত বছর আগে সড়কটি পাকা করার সময় পলাশগাছ লাগানো হয়, দুই বছর ধরে গাছগুলো ফুল দিচ্ছে। গরমের সময় গাছের নিচে বসে থাকা যায়, যা খুবই আরামদায়ক।" মধ্য বুধপাড়ায় দেখা যায়, ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা কয়েকজন তরুণ-তরুণী পলাশ ফুলের ছবি তুলছেন, কেউ কুড়িয়ে নিচ্ছেন ঝরে পড়া ফুল, কেউ আবার হাতে নিয়ে দেখছেন কাছ থেকে। তাঁদেরই একজন তাবাসসুম আক্তার বলেন, "পলাশগাছগুলো এমনভাবে ফুটেছে যে দাঁড়ালেই বোঝা যায়, বসন্ত এসেছে!"
এই প্রকৃতির অনন্য দৃশ্য রাজশাহীবাসী ও দর্শনার্থীদের জন্য বসন্তের একটি বিশেষ উপহার হয়ে উঠেছে, যা শহুরে জীবনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের গুরুত্বকে তুলে ধরছে।
