চট্টগ্রামে তীব্র পানি সংকট: হালদার লবণাক্ততা ও কর্ণফুলীর পানির স্তর কমে উৎপাদন হ্রাস
চট্টগ্রামে পানি সংকট: লবণাক্ততা ও পানির স্তর কমে উৎপাদন হ্রাস

চট্টগ্রামে তীব্র পানি সংকট: হালদার লবণাক্ততা ও কর্ণফুলীর পানির স্তর কমে উৎপাদন হ্রাস

চট্টগ্রাম নগরীতে রমজান শুরুর পর থেকে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। হালদা নদীর পানিতে লবণাক্ততা এবং কর্ণফুলী নদীর পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম ওয়াসার চারটি পানি শোধনাগার প্রকল্পে উৎপাদন কমেছে। নগরীতে দৈনিক ৬০ কোটি লিটার পানির চাহিদার বিপরীতে ওয়াসা আগে ৪৫ থেকে ৫০ কোটি লিটার সরবরাহ করলেও, বর্তমানে লবণাক্ততা এবং পানির স্তর কমে যাওয়ায় নতুন করে উৎপাদন কমেছে সাত কোটি লিটারের। ফলে পানি সংকট নগরবাসীকে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। সংকট কাটাতে রেশনিং পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ করছে চট্টগ্রাম ওয়াসা।

ওয়াসার প্রকল্পগুলিতে উৎপাদন হ্রাসের কারণ

ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, নগরীর জন্য ওয়াসার পানি আসে হালদা ও কর্ণফুলী থেকে। দুই নদীতে অবস্থিত ওয়াসার চারটি পানি শোধনাগার ও সরবরাহ প্রকল্প। এর মধ্যে হালদায় আছে মদুনাঘাট ও মোহরা পানি শোধনাগার প্রকল্প এবং কর্ণফুলীতে রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থিত কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-১ এবং ২ নম্বর প্রকল্প। বর্তমানে জোয়ারের সময় হালদার পানিতে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা দেখা যাচ্ছে। অথচ সহনীয় পর্যায় ৫০ মিলিগ্রাম। এজন্য দুটি প্রকল্প দিনে ছয়-সাত ঘণ্টা পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অপরদিকে কর্ণফুলী পানি শোধনার-১ এবং ২ নম্বর প্রকল্পে ভাটার সময় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। এ কারণে উত্তোলন সম্ভব হয় না। সরবরাহ সচল করতে জোয়ার না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

জানুয়ারির শেষের দিকে ওয়াসার পানিতে এ সমস্যা দেখা দেয়। এখন দিন দিন এই সমস্যা বাড়ছে। লবণাক্ততা এবং পানির স্তর কমে যাওয়ায় ওয়াসার চারটি প্রকল্পে উৎপাদন কমেছে সাত কোটি লিটার পর্যন্ত। এ কারণে রমজানে পানি সংকটে পড়ে দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রাহকরা। বিশুদ্ধ পানির জন্য বিভিন্ন মসজিদের টিউবওয়েল থেকে জোগান দিতে হচ্ছে। তবু সংকট পূরণ হচ্ছে না।

গ্রাহকদের অভিযোগ ও ভোগান্তি

গ্রাহকরা বলছেন সারা বছরই ওয়াসার পানির সংকট। নগরীর আকবর শাহ এলাকার বাসিন্দা সাইফুদ্দিন বলেন, ‘রমজানের শুরু থেকে নিয়মিত ওয়াসার পানি পাওয়া যাচ্ছে না। দিনে কোন সময় পাওয়া যাবে, তাও বুঝতেছি না। সারা বছরই সমস্যা লেগেই থাকে। কোনও সময় ময়লার পাশাপাশি দুর্গন্ধযুক্ত পানিও পাই। গত কিছুদিন ধরে নতুন সমস্যা লবণাক্ততা।’

একই কথা বলেছেন নগরীর বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা মঈন উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘গত কিছুদিন ধরে ওয়াসার পানি সংকট বেড়েছে। দিনের কোনও সময় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। রেশনিং করে পানি পাচ্ছি। এ কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে আমাদের।’

চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান

ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে দৈনিক পানির চাহিদা আছে ৬০ কোটি লিটার। বর্তমানে চারটি শোধনাগার প্রকল্প এবং গভীর নলকূপ থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৪০ থেকে ৪২ কোটি লিটার পানি। সরবরাহ করা পানি থেকে আবার ৩০ শতাংশ ‘হাওয়া’ হচ্ছে। যা ওয়াসার ভাষায় বলা হচ্ছে, সিস্টেম লস।

বর্তমানে ওয়াসার আবাসিকে গ্রাহক সংযোগ ৭৮ হাজার ৫৪২টি ও বাণিজ্যিক সংযোগ আছে সাত হাজার ৭৬৭টি। ৭৭০ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে সংস্থাটি পানি সরবরাহ করে। বেশিরভাগ লাইন পুরোনো হওয়ায় সংকটে থাকতে হয় গ্রাহকদের। লাইনে লিকেজ বা ছিদ্রের কারণে পানি নষ্ট হচ্ছে।

ওয়াসার দুঃখ প্রকাশ ও রেশনিং ব্যবস্থা

এ নিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসা একটি জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ওয়াসার গ্রাহকদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, চলমান শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই লেকে পানির লেভেল কমে যাওয়ায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পানি ছাড়া হচ্ছে না। ফলে মোহরা ও মদুনাঘাট পানি শোধনাগারে হালদা থেকে উত্তোলিত পানিতে লবণাক্ততা অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়েছে। নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ছয়-সাত ঘণ্টা পানি উত্তোলন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। পানি উত্তোলনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছে, ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। সমস্যা সমাধানে নগরীর বিভিন্ন স্থানে রেশনিং পদ্ধতিতে সরবরাহ চালু রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহের মাধ্যমে ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। অনিবার্য প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট সাময়িক অসুবিধার জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছে।

লবণাক্ততা ও নদীতে পানির সংকটের বিশদ বিবরণ

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, ‘সমুদ্রের লবণাক্ত পানি হালদায় ঢুকছে। ভাটার সময় পানিতে লবণাক্ততার সমস্যা কম থাকলেও জোয়ারের সময় তা সহনীয় পর্যায়ে থাকছে না। এই মৌসুমে হালদার পানিতে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে জোয়ারের সময় নদী থেকে ছয়-সাত ঘণ্টা পানি তোলা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী শোধনাগার প্রকল্প-১ এবং প্রকল্প-২ থেকে ১৪ কোটি করে ২৮ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে দুটি প্রকল্প থেকে উৎপাদন হচ্ছে ২৪ কোটি লিটার। একইভাবে মদুনাঘাট শোধনাগার প্রকল্প এবং মোহরা শোধনাগার প্রকল্প থেকে স্বাভাবিক সময়ে ৯ কোটি লিটার করে ১৮ কোটি লিটার সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে তা কমে ১৬ কোটি লিটার সরবরাহ করা হচ্ছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। বর্তমানে হালদার প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা দেখা যাচ্ছে। অথচ সহনীয় পর্যায় ৫০ মিলিগ্রাম। কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত পানি ছাড়া হচ্ছে না। সেই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিও হচ্ছে না। কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত পানি ছাড়া হলে এবং বৃষ্টি হলে লবণাক্ত পানি নদীতে প্রবেশ করতো না। নদীতে এখন মিঠা পানির পরিমাণ কমে জোয়ারের সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। এ কারণে লবণাক্ততা সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে।’

কাপ্তাই লেকে পানির স্তর নেমে যাওয়া

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান বলেন, ‘কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পাঁচটি ইউনিটে ২৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস পানির স্তর কাপ্তাই লেকে অনেক কমে গেছে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়াতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) রুলকার্ভ অনুযায়ী কাপ্তাই হ্রদে পানির উচ্চতা ছিল ৯২ এমএসএল (মিনস সি লেভেল)। অথচ এই সময়ে পানির উচ্চতা থাকার কথা ছিল ৯৪ এমএসএল। পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে দুটি মাত্র ইউনিট পর্যায়ক্রমে চালু রাখা হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৭০ মেগাওয়াট।’

বৃষ্টি ছাড়া উপায় নেই

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা নদী গবেষক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুম এবং কাপ্তাই জল বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি সংকটে বেশিরভাগ ইউনিট বন্ধ থাকায় হালদায় জোয়ারের সময় লবণাক্ততা বেড়েছে। বৃষ্টি হলে কিংবা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়লে লবণাক্ততা কেটে যাবে। পানিতে লবণের সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে ৫০ মিলিগ্রাম। তবে এবার ওয়াসা প্রতি লিটারে ২ হাজার ৯০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা পেয়েছে। এসব পানি কিছুতেই খাবার উপযোগী নয়।’

লবণাক্ত পানিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি

চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করলে শরীরে নানা ধরনের পানিবাহিত রোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই যতটুকু সম্ভব অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পরিহার করে বিশুদ্ধ পানি পান করা প্রয়োজন।’