সংরক্ষিত নারী আসনে 'দাদি-চাচি' মনোনয়নের তীব্র সমালোচনা, সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বের দাবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সংরক্ষিত নারী আসনে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সংরক্ষিত নারী আসনে 'দাদি-চাচিদের' মনোনয়ন দেয়। যেসব পুরুষ জাতীয় নির্বাচনে হেরে যান, তাদের স্ত্রীদের 'সান্ত্বনা' হিসেবে এই আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ফলে এসব আসনে নারীদের সত্যিকার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না।
করুণা বা দয়ার আসন নয়, চান সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব
ফরিদা আখতার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'এখন আর আমরা করুণার আসন চাই না। দয়ার সিট চাই না। আমরা চাই সংসদে নারীর সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব।' তিনি প্রশ্ন তোলেন, সংরক্ষিত আসনে যেসব নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়, তাদের নির্বাচনী এলাকা বলে কিছু থাকে না। এই নারীরা কাদের প্রতিনিধিত্ব করেন? কার স্বার্থ তুলে ধরেন? তিনি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের বর্তমান পদ্ধতির বিরোধিতা করেন এবং প্রয়োজনে মামলা করার হুঁশিয়ারি দেন।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ফরিদা আখতার আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নারী প্রার্থীদের কম মনোনয়ন দিলেও নির্বাচন কমিশন কেন চুপ ছিল, সে প্রসঙ্গে নারীদের কথা বলার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, নির্বাচনে মনোনয়নের সময় যদি রাজনৈতিক দলগুলো ৩০ শতাংশ নারীদের মনোনয়ন দেয়, তাহলে একটা সময় জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের আর দরকার হবে না। যেসব নারী দল থেকে মনোনয়ন না পেয়েও নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তাদের তিনি অভিনন্দন জানান।
বক্তাদের বিভিন্ন দাবি ও সমালোচনা
অনুষ্ঠানে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, নির্বাচনের আগে নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আলাপ ছিল, কিন্তু নারীর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকারের ইঞ্জিনিয়ারিং ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তিনি জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বুলিং ও হেনস্তা নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন ক্ষুব্ধ নারী সমাজের ঋতু সাত্তার। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের প্রধান বিরোধী দলে কোনো নারী সদস্য নেই। এ ব্যাপারে তিনি নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের পক্ষ থেকে নিন্দা জানান।
নারী প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ
অনুষ্ঠানে অংশ নেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী হওয়া নারীরা। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারণী স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ কম। তাই নারীরা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়। মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ পুরুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কাজেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, নারীদের অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা প্রকট। অন্যদিকে, পুরুষেরা বিভিন্ন ব্যক্তি থেকে আর্থিক সহায়তা নিতে পারে। অনলাইনে নারী প্রার্থীদের ভয়াবহ সাইবার আক্রমণের শিকার হতে হয়। কাজেই এই দিকগুলো নারীদের নির্বাচন করা থেকে নিরুৎসাহিত করে।
আন্দোলন ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র ফেলো অব প্র্যাকটিস মাহিন সুলতান বলেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের আন্দোলন স্বাধীনতার পর থেকে চলমান। এখনো সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির আন্দোলন একইভাবে করতে হচ্ছে। তাই আন্দোলনের পাশাপাশি কেন আসলে একজন নারী প্রার্থী দল থেকে মনোনয়ন পাচ্ছেন না, সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে। নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিতে নির্বাচন কমিশন কোথায় ব্যর্থ হয়েছে, সে ব্যাপারে গভীর পর্যবেক্ষণ দরকার, যাতে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়।
অন্যান্য বক্তাদের মতামত
- শেরপুর-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করা সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা অভিযোগ করেন, নির্বাচনে তিনি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড খুঁজে পাননি। নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ দিয়েও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি।
- ঢাকা–১২ আসন থেকে নির্বাচন করা গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ না থাকায় নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্ব কম ছিল।
- লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে নির্বাচন করা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব নির্বাচন কমিশন সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা-৫ আসনে বাসদের প্রার্থী শাহিনুর আক্তার সুমি, ঢাকা–১০ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বহ্নি বেপারী, ঢাকা-১১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কহিনূর আক্তার বীথি, ঢাকা-৭ আসনে বাসদের প্রার্থী সীমা দত্ত, ঢাকা-২০ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন ও নারীপক্ষের সদস্য সাদাফ সাজ সিদ্দিকী।
