নারীর অগ্রগতিতে তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্ক: এক ধাপ এগিয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে
নারীর অগ্রগতিতে তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্ক: এগোনো ও পিছোনো

নারীর অগ্রগতিতে তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্ক: এক ধাপ এগিয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে

নব্বইয়ের দশকের পাটিগণিত বইয়ের সেই অঙ্কটি আজও প্রাসঙ্গিক—একটি বানর তৈলাক্ত বাঁশে প্রতি মিনিটে ৩ হাত উঠে, ২ হাত পিছলে যায়। ২০ হাত উচ্চতার বাঁশে উঠতে তার সময় লাগে ১৮ মিনিট। বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাসও যেন ঠিক তেমনই এক তৈলাক্ত বাঁশের হিসাব-নিকাশে আটকে আছে। একদিকে অর্জনের পাল্লা ভারী, অন্যদিকে প্রতিরোধ ও পিছিয়ে পড়ার বাস্তবতা সমান তীব্র।

অর্জন ও প্রতিবন্ধকতার দ্বৈত সংগ্রাম

স্বাধীনতার পর সংবিধানে নারীর সমঅধিকারের স্বীকৃতি থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পে লাখো নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করেছেন। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অংশগ্রহণও নিশ্চিত হয়েছে আইনগতভাবে।

কিন্তু এই অর্জনের পাশাপাশি বাস্তবতার করুণ চিত্রও সমানভাবে উপস্থিত। নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, বাল্যবিবাহ ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ থেমে নেই। আইনি কাঠামো শক্তিশালী হলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি প্রকট। অধিকারকর্মীদের মতে, আইন থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতা, সামাজিক চাপের মুখে ভুক্তভোগীর কণ্ঠ প্রায়ই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে নিম্নগামী প্রবণতা

জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস বিশ্লেষণে চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। ১৯৭৩-১৯৭৫ মেয়াদের প্রথম সংসদে ১৫টি সংরক্ষিত আসনেই নারী প্রতিনিধি ছিলেন। সময়ের সাথে সাথে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়লেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা কমছে।

  • ১৯৭৯-১৯৮২ মেয়াদে দ্বিতীয় সংসদে ২ জন নির্বাচিত ও ৩০টি সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে মোট ৩২ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন।
  • ১৯৯৬ সালের জুন মাসে সপ্তম সংসদ নির্বাচনে সরাসরি নির্বাচিত হন ৮ নারী, মোট নারী প্রতিনিধি ছিলেন ৩৮ জন।
  • নবম জাতীয় সংসদে ২১ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন, সংরক্ষিত আসন ৫০টি করা হলে মোট নারী সংসদ সদস্য হন ৭০ জন।
  • আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের নির্বাচনে যথাক্রমে ১৮, ২৩ ও ১৯ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন।

এই তথ্য প্রমাণ করে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণের স্তরে নারীর প্রভাব এখনো সীমিত রয়ে গেছে।

শ্রমবাজারে নারীর উপস্থিতি হ্রাস

২০২৫ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ৮০৮ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ২৩৪ জন কন্যা ও ১ হাজার ৫৭৪ জন নারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে—গত বছরে ৭৮৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৫৪৩ জন কন্যা ও ২৪৩ জন নারী।

বিদেশি শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণও আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ইউএন উইমেনের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, লেবানন ও জর্ডানে প্রেরিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় কোথাও অর্ধেকে, কোথাও এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। তৈরি পোশাক খাতেও নারীর উপস্থিতি হ্রাস পাচ্ছে ক্রমাগত।

আন্দোলনের নেত্রীদের প্রত্যাশা ও হতাশা

নারীনেত্রী খুশি কবীর বলেন, “নারী অধিকার আন্দোলনে এক পা এগোলে, দুই পা পিছায়। নারী হিসেবে আমাকে সবসময়ই এক ধাপ পিছেয়েই রাখা হয়। তারপরেও মানুষ যখন অধিকার বুঝে নেওয়ার কথা বলে, তখন আশান্বিত হই।” তিনি উল্লেখ করেন, শুধু আন্দোলনের ভেতরের মানুষই নয়, বাইরের মানুষরাও নারী ইস্যুতে সোচ্চার হচ্ছেন।

গার্মেন্টস সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার অর্জন ও প্রতিরোধের এই দ্বন্দ্বকে পিছিয়ে পড়া হিসেবে দেখতে চান না। তিনি বলেন, “আগে অর্থনৈতিক মুক্তিকে নারীর স্বাধীনতা হিসেবে দেখা হতো। এখন শিক্ষিত, স্বাবলম্বী নারীরা সামনে আছেন। এখন দরকার নাগরিক পরিচয় তৈরি করা।” নারী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধতার অভাব ও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ না বাড়াকে তিনি প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

সমাজ পরিবর্তনের ধীর গতি

গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গাতেই নারী সংগঠনগুলো সচেতনতা, আইনি সহায়তা ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে কাজ করছে। কিন্তু তাতে সমাজ কতটা বদলেছে? বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফৌজিয়া মোসলেম বলেন, “একেবারেই যে এগোয়নি এটা বলা যাবে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম উজ্জ্বল নারীদের সামনে আসতে দেখছি আমরা। অগ্রগতি না হলে এই দৃশ্যমানতা তৈরি হতো না।”

তিনি আরও যোগ করেন, নারীর এগিয়ে যাওয়ার কারণেই বিরোধীরাও নারী ইস্যুকে অ্যাড্রেস করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে প্রথা, আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো নারী আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার জায়গাগুলোতে ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে তিনি মনে করেন। “আমাদের আরও কাজ বাকি আছে,”—এই সত্যটি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

তৈলাক্ত বাঁশে ওঠা বানরের অঙ্কের মতোই নারী আন্দোলনের এই সংগ্রাম—প্রতি ধাপ এগোনোর পথে পিছলে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। কিন্তু আশার কথা, এই ঝুঁকি সত্ত্বেও নারীরা তাদের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, কারণ তারা বিশ্বাস করেন এই পিছিয়ে পড়াই জয়ের পথে এগোনোর অপরিহার্য অংশ।