প্রতিবন্ধী জমেলার ২১ বছরের কুরআন পাঠশালা: বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষাদান
পাবনার চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের ডেফলচড়া গ্রামে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী জমেলা খাতুন। প্রায় ২১ বছর ধরে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে ‘কুরআনের পাঠশালা’ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা সৃষ্টি করেছে।
জমেলার জীবন সংগ্রাম ও শিক্ষার যাত্রা
জমেলা খাতুনের বয়স এখন ৪২ বছর। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি, এবং রাত পার হতে না হতেই তার হাত-পা বাঁকা হয়ে যায়। দিনমজুর বাবার আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি, ফলে তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। এখন দুহাতের ওপর ভর দিয়ে চলাফেরা করতে হয় তাকে।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল জমেলার। স্থানীয় এক হাফেজের কাছে পবিত্র কুরআন শরিফ পড়া শুরু করেন তিনি, এবং পুরো কুরআন আয়ত্তে আনার পর থেকেই শিক্ষাদানে মনোনিবেশ করেন।
কুরআন পাঠশালার দৈনন্দিন রূপ
জমেলার বাড়ির উঠানে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ‘কুরআন শিক্ষার পাঠশালা’ বসে। এখানে বয়োবৃদ্ধ নারী থেকে শুরু করে শিশু-কিশোররা অংশগ্রহণ করেন, এবং কুরআন শরিফের সুরা ও আয়াতের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ।
সরেজমিন দেখা গেছে, জরাজীর্ণ টিনের ঘরের চৌকাঠের ওপর বসে আছেন জমেলা খাতুন, আর বাড়ির উঠানে বসে কুরআন পড়া শিখছে বেশকিছু শিশু-কিশোর ও কিশোরী। অনেক অভিভাবকও তার পড়ানো দেখতে আসেন নিয়মিত।
শিক্ষাদানের ব্যাপকতা ও ত্যাগ
জমেলার মা জয়গুন খাতুন জানান, সারাদিনে কয়েক ধাপে বয়োবৃদ্ধ নারী থেকে শুরু করে অনেকেই এই পাঠশালার ছাত্রী হয়ে ওঠেন। এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজারের অধিক নারী ও শিশু-কিশোরের হাতে পবিত্র কুরআন তুলে দিয়েছেন জমেলা। পরিবারে অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি কারো কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেন না।
বরং কেউ জোর করে টাকা দিলে সেই টাকা দিয়ে দরিদ্রদের কুরআন শরিফ কিনে দেন তিনি। শত কষ্টের মাঝেও ধর্মীয় কাজে নিজেকে উৎসর্গ করতে পেরে সন্তুষ্ট এই প্রতিবন্ধী নারী।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও সংকট
স্থানীয়রা জানান, ২১ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে ধর্মের বাণী প্রচার করে যাওয়া জমেলার জন্য একটি নতুন ঘর হলে পাঠদানে সুবিধার পাশাপাশি সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারতেন তিনি। বর্তমানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় এবং ঘর না থাকায় কুরআন শিখতে আসা সবাইকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
জমেলার কাছে কুরআন শিক্ষাগ্রহণ করা ষাটোর্ধ্ব নারী সাবেলা খাতুন বলেন, “ছোটবেলায় কুরআন শরিফ পড়া শিখেছিলাম, কিন্তু পরে ভুলে গেছি। জমেলার কাছে শিখে এখন কুরআন শরিফ পড়তে পারি। শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও মেয়েটা যেভাবে শেখায়, তাতে মুগ্ধ হয়েছি। এর জন্য জমেলা কোনো টাকা-পয়সাও নেয়নি।”
রাজিয়া খাতুন নামে আরেক নারী যোগ করেন, “মেয়েটার পরিবার খুব অভাবী। এখন পর্যন্ত অনেককে কুরআন পড়া শিখিয়েছে। শত অভাবের মাঝেও টাকা-পয়সার কোনো চাহিদা নেই তার। টাকা দিতে চাইলেও নেয় না। জোর করে দিলেও উলটো সেই টাকা দিয়ে কুরআন শরিফ কিনে বিতরণ করে। তার জন্য একটা নতুন ঘর ও শিক্ষার্থীদের বসে পড়ার জন্য একটা ঘর হলে খুবই উপকৃত হতো।”
জমেলার আকুতি ও আশা
জমেলা খাতুন নিজে বলেন, “সবাই আল্লাহর পথে চলুক। এই দুনিয়াতে মানুষ চিরদিন থাকবে না। মহান আল্লাহ তায়ালার অতি পছন্দ ও তাকে সন্তুষ্টি করতে পবিত্র কুরআন পাঠের কোনো বিকল্প নেই। পরকালের সুখের আশায় শত কষ্টের মাঝেও কুরআন শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি আরও জানান, “আমার ভাঙাচোরা ঘরে ঝড়-বৃষ্টির দিনে পানি পড়ে। আর বাড়ির উঠানে বসে রোদের মধ্যে পড়াতে গিয়ে কষ্ট হয়। আমাকে একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিলে খুব উপকার হতো।”
এই প্রতিবন্ধী নারীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিঃস্বার্থ সেবা স্থানীয় সম্প্রদায়কে অনুপ্রাণিত করছে, তবে ঘরের অভাব তার মহৎ কাজে বাধা সৃষ্টি করছে। আশা করা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা দানশীল ব্যক্তিরা তার এই সংকট দূর করতে এগিয়ে আসবেন।
