ইমাম দাউদ আত-তায়ির আধ্যাত্মিক জীবন: বৈরাগ্য, দারিদ্র্য ও আল্লাহর সান্নিধ্য
দাউদ আত-তায়ির আধ্যাত্মিক জীবন: বৈরাগ্য ও আল্লাহর সান্নিধ্য

ইমাম দাউদ আত-তায়ির আধ্যাত্মিক জীবন: বৈরাগ্য, দারিদ্র্য ও আল্লাহর সান্নিধ্য

ইমাম আবু হানিফার ছাত্র দাউদ ইবনে নুসাইর আত-তায়ি ছিলেন বরেণ্য ইসলামী পণ্ডিত ও আধ্যাত্মিক সাধক। হিজরি ১৬০ থেকে ১৬৫ সালের মধ্যে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, যা ৭৭৭-৭৮২ খ্রিস্টাব্দের সমতুল্য। তাঁর জীবন ছিল বৈরাগ্য, দারিদ্র্য ও আল্লাহর সান্নিধ্যে কাটানো এক অনন্য অধ্যায়।

বৈরাগ্যের সূচনা ও ইমাম আবু হানিফার নির্দেশনা

দারিদ্র্যশুরু থেকেই দাউদ আত-তায়ি গভীর অন্তর্গত দুঃখে ভারাক্রান্ত ছিলেন এবং মানুষের সমাজ এড়িয়ে চলতেন। একদিন দুঃখবতী নারীর কবিতা আবৃত্তি শুনে তাঁর মনে মহাদুঃখ জাগে, যা তাঁকে ইমাম আবু হানিফার পাঠদানে যোগ দিতে প্ররোচিত করে। আবু হানিফা জিজ্ঞাসা করলে, দাউদ বলেন, ‘পৃথিবী আমার কাছে তার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে, আর আমার অন্তরে এমন কিছু ঘটেছে যা আমি বুঝতে পারছি না, কোনো বই বা আইনে এর ব্যাখ্যা পাচ্ছি না।’ ইমাম আবু হানিফা নির্দেশ দেন, ‘তুমি চেনা সংস্রব থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলো।’ দাউদ তাই নিজেকে অন্তরিন করে রাখেন।

আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর হওয়া

দীর্ঘ বিরতির পর আবু হানিফা দাউদের সঙ্গে দেখা করে বলেন, ‘তোমার জন্য সঠিক পন্থা হলো ইমামদের পায়ের কাছে বসে তাঁদের চিন্তা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ধৈর্য ধরে, কোনো কথা না বলে।’ দাউদ এক বছর ইমামদের চরণে বসে থাকেন, শুধু শোনেন, কোনো প্রত্যুত্তর দেন না। পরে তিনি মন্তব্য করেন, ‘সেই এক বছরের ধৈর্য ৩০ বছরের কঠোর পরিশ্রমের সমান।’ এরপর তিনি হাবিব আর-রায়ির সান্নিধ্যে গিয়ে নিগূঢ় পথের দীক্ষা নেন এবং সব বইপত্র ইউফ্রেতিস নদীতে ছুড়ে ফেলে দেন, লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান।

দারিদ্র্য ও কঠোর সংযম

দাউদ আত-তায়ি পারিবারিক সূত্রে পাওয়া কুড়িটি দিনার বিশ বছর ধরে খরচ করেন। শায়খরা ভর্ৎসনা করলে তিনি বলেন, ‘কেবল মনের শান্তি নিশ্চিত করতে এই অর্থ জমিয়ে রেখেছি, মরার আগপর্যন্ত এটা দিয়েই চলে যাবে।’ তিনি রুটি পানিতে ভিজিয়ে খেতেন এবং বলতেন, ‘এই পানি-রুটি খাওয়ার সময়ে কোরআনের পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করতে পারি, আমি কেন জীবন নষ্ট করব?’ একবার শুকনো রুটি হাতে কাঁদতে দেখা গেলে তিনি বলেন, এটি বৈধ উপায়ে অর্জিত কি না তা জানেন না।

জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও শিক্ষা

দাউদের প্রাসাদের কুঠুরিগুলো জীর্ণ হলে তিনি সেগুলো মেরামত করতেন না, বলতেন, ‘আমি আল্লাহর সঙ্গে চুক্তি করেছি এই পৃথিবীকে আর মেরামত না করার।’ ধীরে ধীরে পুরো প্রাসাদ ধসে পড়ে, শুধু বারান্দা থাকে। যে রাতে তিনি মারা যান, সেদিন বারান্দাও পড়ে যায়। বিয়ে না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো বিশ্বাসী নারীকে আমি ঠকাতে পারব না, কারণ ধর্মীয় কর্তব্য ও পার্থিব কাজ একসঙ্গে মনোযোগ দিতে পারব না।’ দাড়ি আঁচড়ানোর প্রস্তাবেও তিনি বলেন, এর জন্য অবসর নেই।

হারুন-আল-রশীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ

হারুন-আল-রশীদ আবু ইউসুফের মাধ্যমে দাউদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে, দাউদ প্রথমে প্রত্যাখ্যান করেন। মায়ের শপথে তিনি সাক্ষাৎ দেন। হারুন কাঁদতে থাকেন এবং স্বর্ণমুদ্রা রেখে যান, যা দাউদ ফেরত দেন, বলেন, ‘আমার এসবের প্রয়োজন নেই, পবিত্র উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বাড়ি বিক্রির অর্থে জীবন চলে, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি তা শেষ হলে প্রাণ নিয়ে নেন।’ আবু ইউসুফ হিসাব করে দেখেন, দাউদের অর্থ শেষ হলে তিনি মারা যান, যা তাঁর প্রার্থনা কবুল হওয়ার প্রমাণ।