আফগানিস্তানে প্রথম রোজা: ইফতার ও ঐতিহ্যে একতার সুবাস
আফগানিস্তানে প্রথম রোজা: ইফতার ও ঐতিহ্যে একতা

আফগানিস্তানে প্রথম রোজা: ইফতার ও ঐতিহ্যে একতার সুবাস

আফগানিস্তানের আকাশে রমজানের নতুন চাঁদ দেখা দিলে, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট এবং অনিশ্চয়তার মাঝেও দেশজুড়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে। হিন্দুকুশ পর্বতের বরফঢাকা চূড়া থেকে শুরু করে কান্দাহারের ধুলোবালি ওড়ানো রাজপথ—সবখানে এক সুরে বেজে ওঠে একতার মন্ত্র। আফগানদের জাতিগত, ভাষাগত এবং রাজনৈতিক বিভেদ অনেক থাকলেও, রমজান তাদের এক সুতোয় গেঁথে ফেলে, যা দেশটির সংস্কৃতির একটি গভীর অংশ হয়ে উঠেছে।

‘বোলানি’: ইফতারের দস্তরখানের প্রধান আকর্ষণ

আফগান ইফতারের আয়োজন যতটা সাধারণ, ততটাই আন্তরিক। সেখানে আড়ম্বর কম থাকলেও ভালোবাসার কমতি থাকে না। শুরুটা হয় সবুজ চায়ে, যা খেজুর এবং লবঙ্গ-দারুচিনি মিশ্রিত সুগন্ধি পানীয় হিসেবে পরিবেশন করা হয়। তবে ইফতারের মূল আকর্ষণ হলো বোলানি। এটি পাতলা রুটির ভেতরে আলু, পালং শাক বা মাংসের পুর দিয়ে ভাজা একটি জনপ্রিয় খাবার, যা ধনীর তশতরি থেকে গরিবের প্লেট—সবখানে দেখা যায়।

মূল খাবারের আয়োজনে থাকে জর্দা, কিশমিশ ও গাজরের কুচি মেশানো বিখ্যাত আফগান পোলাও এবং মাংস ও সবজি দিয়ে তৈরি পুষ্টিকর স্যুপ বা শুরবা। এই খাবারগুলো শুধু পেট ভরায় না, বরং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে আরও মজবুত করে তোলে।

রাজপথে ‘নুসরতের’ দৃশ্য: সাহায্যের হাত

আফগান শহরগুলোতে বর্তমানে একটি নতুন চিত্র দেখা যায়। ইফতারের সময় হলে সরকারি কর্মচারী কিংবা সাধারণ তরুণরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে যান। তারা হাতে খাবার ও পানির প্যাকেট নিয়ে পথচারী ও অভাবী মানুষের জন্য অপেক্ষা করেন। এটা ‘নাসর’ বা ‘নুসরত’ নামে পরিচিত, যার অর্থ সাহায্য করা। কাবুল কিংবা কান্দাহারের রাস্তায় এখন আর বন্দুকের নল দেখে মানুষ চমকে ওঠে না। অদ্ভুত এক দৃশ্য চোখে পড়ে আসরের পর—ইসলামি আমিরাত সরকারের কর্মীরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

কান্দাহার বা কাবুলের রাজপথে যখন ৭০০-৮০০ মানুষ সারিবদ্ধভাবে বসে ইফতার করেন, তখন মনে হয় না যে এই দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্য আফগান সমাজের সহমর্মিতা এবং ঐক্যের একটি জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

ঐতিহ্যের ‘ডোহুল’ ও ‘রমজান খানি’

আফগানিস্তানের কিছু অঞ্চলে আজও পুরনো ঐতিহ্যগুলো বেঁচে আছে। সেহরির সময় মানুষকে জাগানোর জন্য এক ধরনের বিশেষ ড্রাম বা ঢোল বাজানো হয়, যাকে বলা হয় ‘ডোহুল’। এটি যেন যান্ত্রিক যুগেও এক হৃদস্পন্দনের মতো, যা সম্প্রদায়ের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে।

পশ্চিম আফগানিস্তানের হেরাত শহরে শতাব্দীর পুরনো এই ঐতিহ্যটি এখনও বিদ্যমান। সেখানে রমজানকে স্বাগত জানিয়ে বিশেষ আধ্যাত্মিক গান বা নাশিদ পরিবেশন করা হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘রমজান খানি’ নামে পরিচিত। এই ঐতিহ্যগুলো আফগান সংস্কৃতির গভীর শিকড়কে প্রতিফলিত করে।

সংকটে যখন ধর্মই শক্তি

আফগানিস্তানের জনসংখ্যার ৯৯.৭ শতাংশই মুসলিম। ভাষা বা জাতিগত বিভেদ থাকলেও রমজানের চাঁদ উঠলে সবাই এক হয়ে যায়। বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি ধুঁকছে। কিন্তু আফগানরা তাদের ঐতিহ্যগত পারস্পরিক সহযোগিতা ভোলেনি। যেখানে বিশ্বের অনেক দেশে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, সেখানে আফগান সরকার এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা ভেবে দাম কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

এই প্রচেষ্টাগুলো শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, বরং সামাজিক সংহতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। রমজান মাস আফগানিস্তানে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একতা, সহমর্মিতা এবং ঐতিহ্যের একটি মিলনস্থল হয়ে উঠেছে, যা দেশটির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোর মাঝেও আশার আলো জ্বালিয়ে রাখে।