বগুড়ায় ১৯ বছর ধরে এক প্লেটে ইফতার, সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন
প্রায় দুই দশক ধরে বগুড়া শহরের বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল জামে মসজিদে চলছে একসঙ্গে ইফতারের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। স্থানীয় মুসল্লি ও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় প্রতিদিন গড়ে এক হাজার মানুষ এখানে সমবেত হন, যেখানে ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই। সম্প্রতি শুক্রবারের দৃশ্য ছিল আরও বেশি প্রাণবন্ত, যেখানে রিকশাচালক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এক প্লেটে ভাগাভাগি করে ইফতার করেন।
ইফতারের প্রস্তুতি ও বিতরণ প্রক্রিয়া
দুপুরের পর থেকেই স্বেচ্ছাসেবীদের ব্যস্ততা শুরু হয়। আসরের নামাজের পর প্লেটে সাজানো হয় রকমারি ইফতার সামগ্রী। বড় বড় প্লেটে খেজুর, ছোলা, পেঁয়াজি, বেগুনি, মুড়ি, জিলাপি, তরমুজ, বিরিয়ানি বা খিচুড়ি এবং শরবত রাখা হয়। ইফতারের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এসব প্লেট রোজাদারদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়। মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন জানান, ২০০৮ সালে মসজিদে নামাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। মাসজুড়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১০০০ মানুষের মধ্যে ইফতার বিতরণ করা হয়, যার জন্য রোজার আগে থেকেই তহবিল গঠন ও প্রস্তুতি শুরু হয়।
খাদ্য প্রস্তুতি ও অর্থায়নের বিবরণ
মসজিদের খাদেম মো. রবিউল ইসলামের তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে ১০০০ মানুষের জন্য ইফতার প্রস্তুত করা হয়। খিচুড়ির জন্য এক থেকে সোয়া মণ সুগন্ধি চাল ও এক মণ সবজি লাগে। সপ্তাহে দুদিন ১৫ থেকে ২০ কেজি গরুর মাংস দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করা হয়, যার জন্য বাবুর্চি নিয়োজিত থাকেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মুসল্লিদের অনুদানে এবার তহবিলে প্রায় চার লাখ টাকা জমা হয়েছে। আরেক খাদেম আবদুল করিম যোগ করেন, মাসজুড়ে ইফতার আয়োজন থাকলেও অন্তত ১০ দিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, অঙ্গসংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইফতার করা হয়, বাকি প্রায় ২০ দিন মসজিদ কমিটির ব্যবস্থাপনায় চলে।
ইফতারকারীদের অনুভূতি ও সামাজিক প্রভাব
রিকশাচালক নবীর উদ্দিন বলেন, সারা দিনে গড়ে ৫০০ টাকা আয় হয়, যা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয় এবং ১০০ টাকার নিচে ইফতার কেনা যায় না। তাই তিনি এখানে ইফতারে আসেন, যেখানে ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই। শিক্ষার্থী মুনতাসির রাফি বলেন, মেসে থাকা সবাই এ মসজিদে ইফতার করতে আসেন এবং এক প্লেটে চার-পাঁচজন ভাগাভাগি করার অনুভূতি অন্যরকম, যা পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ। সারিয়াকান্দির বাসিন্দা লাল মিয়া শেখও একই প্লেটে বিরিয়ানিসহ ইফতার খেয়ে পেট ভরার কথা জানান।
মসজিদের ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
মসজিদ কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতা হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, মসজিদটি নির্মাণ করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ তিনি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং দীর্ঘ সময় পর গত ৩০ জানুয়ারি এখানে জুমার নামাজ আদায় করেন। এই আয়োজন শুধু রোজাদারদের সেবা নয়, বরং সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা সম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
