রমজানে নবীজির (সা.) ইবাদতের নিয়ম: সাহরি থেকে তারাবি পর্যন্ত পবিত্র দিনগুলোর রুটিন
রমজান মাস শুরু হওয়ার আগ থেকেই নবীজি (সা.) পবিত্র এই মাসের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিতেন। রমজান শুরু হলে তিনি নিজেকে পুরোপুরি ইবাদতে মশগুল করে রাখতেন। নামাজ, দান-সদকা, কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া, জিকির এবং বিশেষ করে লাইলাতুল কদরের সন্ধানে তিনি সারাদিন ব্যস্ত থাকতেন। রমজানের শেষ দশকে তিনি তাঁর পরিবারকেও ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিতেন, যাতে সবাই এই পবিত্র সময়ের পুরো সুযোগ নিতে পারে।
সাহরির সময় নবীজির (সা.) অভ্যাস
রমজানে নবীজি (সা.) দিনের বেলা রোজা রাখতেন এবং সাহরির সময় অল্প খাবার গ্রহণ করতেন। তিনি সাধারণত তাঁর কোনো এক স্ত্রীর সঙ্গে সাহরি করতেন, তবে কখনও কখনও সাহাবিদের সঙ্গেও সাহরি করতেন। সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিতের সঙ্গে তাঁর সাহরির খাওয়ার বর্ণনা হাদিসে পাওয়া যায়। সাহরিতে তিনি বেশিরভাগ সময় খেজুর ও অল্প খাবার খেতেন এবং শেষে পানি পান করতেন। সাহরি শেষে তিনি ফজরের নামাজ আদায় করতেন, সাহরি ও ফজরের নামাজের মধ্যে প্রায় ৫০টি কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করার মতো সময়ের ব্যবধান রাখতেন।
ফজরের নামাজ ও সূর্যোদয় পর্যন্ত ইবাদত
সাহরির পর নবীজি (সা.) ফজরের সুন্নাত নামাজ আদায় করতেন এবং তাঁর হুজরায় অপেক্ষা করতেন। বেলাল (রা.) জামাতের ইকামত দিলে তিনি হুজরা থেকে বের হয়ে ফজরের নামাজের ইমামতি করতেন। ফজরের নামাজ শেষে তিনি সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে বসে আল্লাহর জিকির করতেন। প্রায় ২০ মিনিট বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করে তিনি দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। এই বিষয়ে তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি জামাআতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করবে, সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে বসে আল্লাহর জিকির করবে এবং তারপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করবে, তার জন্য হজ্জ ও ওমরাহর পরিপূর্ণ সাওয়াব হবে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৮৬)
ইফতারের সময় নবীজির (সা.) পদ্ধতি
নবীজি (সা.) মাগরিবের নামাজের আগে তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তাজা খেজুর না থাকলে শুকনা খেজুর খেতেন, আর তা না থাকলে শুধু পানি পান করতেন। ইফতারের আগে তিনি তাসবিহ ও কিছু দোয়া পাঠ করতেন। মাগরিবের আজান হলে তিনি তাঁর কোনো স্ত্রীর মাধ্যমে ইফতারের ব্যবস্থা করতেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, “নবীজি মাগরিবের নামাজের আগে কিছু তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তাজা খেজুর না থাকলে শুকনা খেজুর, তা না থাকলে পানি পান করতেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬৯৬) ইফতারের পর তিনি মসজিদে মাগরিবের ফরজ নামাজ আদায় করতেন, নামাজ শেষে ঘরে ফিরে সুন্নাত নামাজ পড়তেন এবং স্ত্রীদের সঙ্গ দিতেন।
তারাবি ও বিতর নামাজের বিশেষ গুরুত্ব
নবীজি (সা.) সাহাবিদের নিয়ে মসজিদে তিনবার তারাবি নামাজ আদায় করেছেন, তারাবি নামাজ ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি এর চেয়ে বেশি পড়েননি। তারাবি নামাজ শেষে তিনি ঘরে ফিরে দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায় করতেন, তারপর ঘুমিয়ে পড়তেন এবং ঘুম থেকে উঠে বিতির নামাজ আদায় করতেন। আয়িশা (রা.) একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আল্লাহর রাসুল, বিতর নামাজের আগে আপনি কি ঘুমান?” নবীজি (সা.) উত্তর দিলেন, “আয়িশা, উভয় চোখ ঘুমায়, কিন্তু আমার অন্তর ঘুমায় না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৬)
কোরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা ও এতেকাফ
রমজান মাসে নবীজি (সা.) নিজেকে কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, সদকা ও রোজায় ব্যস্ত রাখতেন। রমজান মাসের শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক রাত্রে জিবরাঈল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন এবং তিনি তাঁকে কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৬৩৫)। তিনি অধিক পরিমাণে দান করতেন, বিশেষ করে রমজানে। সাহাবিরা তাঁকে প্রবাহমান বাতাসের মতো উদার বলেছিলেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নবীজি সর্বাপেক্ষা দানশীল ছিলেন, এবং তাঁর বদান্যতা বেড়ে যেতো রমজানের পবিত্র দিনে যখন জিবরাঈল তাঁর সাক্ষাতে আসতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩০২)।
এতেকাফ ও লাইলাতুল কদরের সন্ধান
রমজানের শেষ দশকে নবীজি (সা.) মসজিদে এতেকাফ করতেন, জীবনের শেষ বছরে তিনি ২০ দিন পর্যন্ত এতেকাফ করেছিলেন। তিনি বিশেষভাবে লাইলাতুল কদরের রাত পাওয়ার সন্ধানে ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৯৩) শেষ দশকে তিনি তাঁর পরিবারকে জাগিয়ে রাখতেন, যাতে তারা ইবাদতে ব্যস্ত থাকে। হজরত আলি (রা.) বলেন, “আল্লাহর রাসুল তাঁর পরিবারের লোকদের রমজানের শেষ দশকে জাগাতেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭৯৫)
দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা
নবীজি (সা.) রমজানে অধিক পরিমাণে দোয়া করতেন। আয়েশা (রা.) একবার জিজ্ঞাসা করলেন, “আল্লাহর রাসুল, বলুন তো, যদি আমি কদর রাত পেয়ে যাই, তাহলে কী দোয়া করব?” নবীজি (সা.) উত্তর দিলেন, “তুমি বলবে, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নি। অর্থাৎ, আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল ক্ষমাকে ভালোবাসেন। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৮৫০) এইভাবে নবীজির জীবন থেকে আমরা রমজানের পবিত্র দিনগুলো কীভাবে ইবাদতে কাটানো যায় তার অনুসরণীয় দিকনির্দেশনা পাই।
