রমজানের ঐতিহ্যবাহী প্রথা: কাসিদা থেকে কামান পর্যন্ত
পবিত্র রমজান মাস বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য ত্যাগ, ইবাদত ও সম্প্রীতির সময়। এই মাসে শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানই নয়, বিভিন্ন দেশে চলে আসছে নানা ঐতিহ্যবাহী প্রথা, যা সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে। পুরান ঢাকার কাসিদা গান থেকে শুরু করে মিসরের কামান দাগা—এসব প্রথা রমজানের আবহকে করে তোলে আরও সমৃদ্ধ।
পুরান ঢাকার কাসিদা: হারিয়ে যাওয়া এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
'সাবকো রোজা রাখনে কি য়া আল্লাহ তাওফিক দে, সাবকো নামাজ পাড়নে কি য়া আল্লাহ তাওফিক দে।' পুরান ঢাকায় রমজান মাসে রাতের শেষ প্রহরে এমন সংগীতের সুর ভেসে আসত মহল্লায় মহল্লায়। এই সংগীতের নাম কাসিদা, যা আরবি শব্দ থেকে এসেছে এবং এর অর্থ প্রশংসামূলক কবিতা। মোগল আমল থেকে শুরু হওয়া এই প্রথায় সাহরির আগে রোজাদারদের জাগিয়ে তোলার জন্য কাসিদা গাওয়া হতো, এবং এটি সওয়াবের কাজ হিসেবে বিবেচিত হত। ঈদের দিনে কাসিদা গায়কের দলগুলো মহল্লার বাড়ি বাড়ি ঘুরে নজরানা সংগ্রহ করতেন। তবে সময়ের পরিবর্তনে ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে এই সুন্দর প্রথাটি এখন প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে।
কাশ্মীর থেকে দিল্লি: সাহার খান ও মুনাদির ভূমিকা
ভূস্বর্গ খ্যাত কাশ্মীরেও সাহরির আগে রোজাদারদের ঘুম ভাঙানোর এক অনন্য প্রথা রয়েছে। সেখানে একদল মানুষ, যাঁরা স্থানীয়ভাবে 'সাহার খান' নামে পরিচিত, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বাজনার তালে তালে 'ওয়াক্ত-ই-সাহার' বলে ঘোষণা দেন। অন্যদিকে, দিল্লির পুরোনো অংশে এই দায়িত্ব পালন করেন 'মুনাদি' নামের ব্যক্তিরা, যাঁরা ঢোল বাজিয়ে সময় জানান দেন এবং ঐতিহ্যবাহী কুর্তা, পাজামা ও টুপি পরিধান করেন। এই রেওয়াজও মোগল আমল থেকে চলে আসছে, কিন্তু আশির দশকের পর থেকে এর প্রচলন কমে গেছে, যা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষতি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
মিসরের কামান দাগা: ইতিহাসের মজাদার কাহিনি
মিসরের রাজধানী কায়রোয় ইফতারের সময় জানান দেওয়া হয় কামান দেগে, যার পেছনে রয়েছে একটি আকর্ষণীয় ইতিহাস। পঞ্চদশ শতকে মামলুক সালতানাতের সময় সুলতান একটি কামান উপহার পেয়ে রমজানের এক সন্ধ্যায় তা পরখ করতে গিয়ে দাগেন। তোপধ্বনিতে কায়রোবাসী ইফতারের সময় হয়েছে মনে করে, যা সুলতানকে এই প্রথা চালু করতে উদ্বুদ্ধ করে। ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত আসল গোলা ব্যবহার করা হলেও পরে শুধু ফাঁকা আওয়াজের মাধ্যমে এটি করা হয়। এই প্রথা ধীরে ধীরে সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, তুরস্ক, ইরাকসহ উপসাগরীয় অঞ্চল ও উত্তর আফ্রিকার অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
রমজানের সাজসজ্জা: লন্ঠন থেকে সম্প্রীতির আচার
রমজান মাসকে সাজসজ্জার মাধ্যমে বরণ করার প্রথা বহু দেশে প্রচলিত। মিসরীয় সভ্যতা থেকে উদ্ভূত লন্ঠন এই সজ্জার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, যা কায়রোর দোকানপাট ও ঘরবাড়ি আলোকিত করে। গাজায় যুদ্ধ ও নৃশংসতার মধ্যেও ফিলিস্তিনিরা ঐতিহ্য রক্ষায় লন্ঠন দিয়ে ঘর সাজান। আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোয় বাহারি রঙের আলো ও চাঁদ-তারার নকশা নজর কাড়ে, উত্তর আফ্রিকায় আরব্য শৈলীর নকশাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
রমজান ত্যাগ ও সম্প্রীতির মাস হিসেবে, আরব দেশগুলোয় মহল্লার সবাই একসঙ্গে ইফতার করার প্রথা রয়েছে, যেখানে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে অংশগ্রহণ করেন। মিসরে প্রত্যেকে কিছু না কিছু খাবার নিয়ে আসেন, আর পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগালে 'তেরাঙ্গা' সংস্কৃতি—যার অর্থ আতিথেয়তা—রমজানে বিশেষভাবে চর্চিত হয়। সেখানে ইফতার বা 'এনদোগোউ' থেকে কাউকে বঞ্চিত না করার চেষ্টা করা হয়, যা সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এই সমস্ত প্রথা শুধু ধর্মীয় আচারই নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক, যা রমজান মাসকে করে তোলে আরও বৈচিত্র্যময় ও অর্থবহ। তবে আধুনিক যুগে অনেক প্রথা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা আমাদের সচেতনতা ও সংরক্ষণের আহ্বান জানায়।
