ড. খালিদ হোসেনের সান্নিধ্যে: ব্যক্তিগত সহকারীর অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার গল্প
ড. খালিদ হোসেনের সান্নিধ্যে: সহকারীর অভিজ্ঞতা

অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের সান্নিধ্যে কাটানো দিনগুলো আমার জীবনের এক অমূল্য অধ্যায়। তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যার সাদাসিধে জীবনযাপনের মধ্যেও অন্তর্গত মহিমা সমুজ্জ্বল। প্রতি শুক্রবার জুমআর খুৎবা প্রদান, সাপ্তাহিক হাদিসের দরস জিরি মাদ্রাসায় এবং আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবে তার ভূমিকা তাকে জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক করে তুলেছে।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও আমানতের ভার

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট, একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে, তিনি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এটি কেবল একটি পদ গ্রহণ নয়, বরং এক গভীর আমানতের ভার কাঁধে তুলে নেওয়া। এরপর তিনি আমাকে তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন, যা আমার জীবনের এক অনন্য প্রাপ্তি।

নেতৃত্বের প্রকৃত রূপ

তার সান্নিধ্যে থেকে আমি প্রত্যক্ষ করেছি, নেতৃত্ব মানে ক্ষমতার উচ্চারণ নয়, বরং চরিত্রের দৃঢ়তা। তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ, সংবিধানিক অঙ্গীকার এবং গণমানুষের কল্যাণের মধ্যে এক অপূর্ব সেতুবন্ধন রচনা করেছেন। তার সিদ্ধান্তে সুস্পষ্টতা, কর্মে শৃঙ্খলা এবং আচরণে বিনয় ও মানবিকতা ছিল লক্ষণীয়।

দেশ-বিদেশের সফর ও অভিজ্ঞতা

রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেশ-বিদেশের নানা সফরে তার সফরসঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। দীর্ঘ যাত্রা ও ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যেও তার সময়নিষ্ঠা ও আত্মমর্যাদাবোধ অটুট ছিল। বিদেশে তিনি নিজেকে ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং দেশের মর্যাদার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করতেন।

হজ ব্যবস্থাপনা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা

২০২৫ সালে পবিত্র হজ ব্যবস্থাপনা টিমে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন আমার জীবনের আরেকটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়। আল্লাহর মেহমানদের সেবা করা একদিকে গুরুদায়িত্ব, অন্যদিকে মহাসৌভাগ্য। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে নেতৃত্বের মূল ভিত্তি বিনয় এবং ইবাদতের সৌন্দর্য দায়িত্ববোধে নিহিত।

একটি সংবেদনশীল মুহূর্ত

একদিন গাড়িতে সফরের সময় তিনি পীর জুলফিকার আলি নকশবন্দির কবিতা শুনছিলেন। হঠাৎ তার চোখ ভিজে উঠল, এবং তিনি নীরবে অশ্রু মুছে নিলেন। এই মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করলাম, তার হৃদয় কতটা সংবেদনশীল ও আলোকিত। তার নিয়মিত নামাজ ও আধ্যাত্মিক চর্চা প্রমাণ করে, দায়িত্ব ও আধ্যাত্মিকতা পরস্পরের পরিপূরক।

সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা

ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দেড় বছর দায়িত্ব পালনকালে যেসব সিনিয়র কর্মকর্তা ও সহকর্মীদের সান্নিধ্য পেয়েছি, তা আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ। বিশেষভাবে ছাদেক আহমদ ভাইয়ের স্নেহভরা শাসন ও নির্ভুল দিকনির্দেশনা আমাকে নতুন করে গড়ে তুলেছে। তারা শুধু সহকর্মী ছিলেন না, বরং পথচলার সঙ্গী ও নির্ভরতার আশ্রয়।

বিদায় ও নতুন যাত্রা

দেড় বছর আগে যখন এই মন্ত্রণালয়ের দরজায় প্রথম পা রেখেছিলাম, তখন আমি এসেছিলাম একটি দায়িত্ব নিয়ে। কিন্তু আজ বিদায়ের মুহূর্তে আমি নিয়ে যাচ্ছি অসংখ্য স্মৃতি, ভালোবাসা ও অমূল্য শিক্ষা। আজ আমরা একসঙ্গে যাত্রা করছি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে, যা একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

মহান আল্লাহ তার জীবনকে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণে পরিপূর্ণ করুন, এই প্রার্থনা অন্তরের গভীর থেকে উচ্চারিত হয়। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে নেতৃত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য নৈতিক দৃঢ়তা ও আত্মিক সততায় নিহিত।