মার্কিন সামরিক বাহিনীতে খ্রিষ্টান উগ্রবাদের অভিযোগ: ইরান যুদ্ধকে 'শেষ জমানা'র অংশ বলছে কমান্ডাররা
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে কমান্ডাররা ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধকে বাইবেলে বর্ণিত 'শেষ জমানা' বা আর্মাগেডনের অংশ হিসেবে সেনাসদস্যদের সামনে তুলে ধরছেন। একটি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার কাছে জমা পড়া অভিযোগ থেকে এমন তথ্য উঠে এসেছে, যা মার্কিন সেনাবাহিনীতে খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদী প্রভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ
মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) নামক একটি সংস্থা জানিয়েছে, তারা নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, স্পেস ফোর্সসহ মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখা থেকে ২০০টিরও বেশি অভিযোগ পেয়েছে। একটি অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে 'যেকোনো মুহূর্তে' অভিযানে অংশ নিতে পারে এমন একটি ইউনিটের নন-কমিশনড অফিসার (এনসিও) তাঁর কমান্ডারের বক্তব্য সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, কমান্ডার সেনাসদস্যদের বলতে নির্দেশ দিয়েছেন যে এই যুদ্ধ 'ঈশ্বরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ'। কমান্ডার বাইবেলের একটি অংশ উদ্ধৃত করে আর্মাগেডন এবং যিশুখ্রিষ্টের আসন্ন প্রত্যাবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। আরও চাঞ্চল্যকরভাবে, তিনি দাবি করেছেন যে যিশুখ্রিষ্ট স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মনোনীত করেছেন, যেন তিনি ইরানে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে আর্মাগেডন শুরু করেন এবং এর মাধ্যমে পৃথিবীতে যিশুর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত হয়।
অভিযোগকারীদের পরিচয় ও প্রতিক্রিয়া
ওই কর্মকর্তা মোট ১৫ জন সেনাসদস্যের পক্ষে এই অভিযোগ দাখিল করেছেন, যাদের মধ্যে ১১ জন খ্রিষ্টান, একজন মুসলিম এবং একজন ইহুদি ধর্মাবলম্বী রয়েছেন। এমআরএফএফ প্রথমে স্বাধীন সাংবাদিক জোনাথন লারসেনকে এই বিষয়টি জানায়, যা পরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এমআরএফএফের প্রেসিডেন্ট ও বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মাইকি ওয়াইনস্টাইন বলেন, 'ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র যখনই মধ্যপ্রাচ্যে কোনোভাবে যুক্ত হয়, তখনই আমাদের সরকারের এবং বিশেষ করে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এই খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা আমাদের নজরে আসে।' তিনি যোগ করেন, সামরিক বাহিনীর সদস্যরা প্রায়ই নিজেদের হয়ে রুখে দাঁড়াতে পারেন না, কারণ সামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব বেসামরিক জীবনের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর।
ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ নীতির লঙ্ঘন
ওয়াইনস্টাইন একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, এসব প্রতিবেদন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে খ্রিষ্টান উগ্রবাদ বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। অভিযোগকারীরা তাঁদের 'কমান্ডারদের অবাধ উল্লাসের' কথা জানিয়েছেন, যারা মনে করেন এই যুদ্ধ 'বাইবেল দ্বারা অনুমোদিত' এবং এটি কট্টরপন্থী খ্রিষ্টানদের বহু প্রতীক্ষিত 'শেষ জমানা' অতি দ্রুত ঘনিয়ে আসার এক অনিবার্য লক্ষণ।
তিনি এটিকে গির্জা ও রাষ্ট্রের পৃথক্করণের নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, যিনি খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদের সমর্থক হিসেবে পরিচিত, এর আগে 'স্বায়ত্তশাসিত পরিমণ্ডল' মতবাদকে সমর্থন করেছিলেন। এই দর্শন উগ্র ধর্মবিশ্বাস থেকে উদ্ভূত এবং এটি সমকামিতার জন্য মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর পুরুষতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে কথা বলে।
পেন্টাগনের প্রতিক্রিয়া ও প্রাসঙ্গিকতা
এসব অভিযোগের বিষয়ে পেন্টাগনের কাছে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা সরাসরি কোনো উত্তর দেয়নি। এর বদলে তারা ইরানের অভিযান নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কিছু প্রকাশ্য আলোচনার ভিডিও পাঠিয়েছে, যা সম্ভবত এই ইস্যু এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
এই ঘটনাটি মার্কিন সামরিক বাহিনীতে ধর্মীয় প্রভাবের একটি উদ্বেগজনক দিক তুলে ধরছে, বিশেষ করে যখন ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে উত্তেজনা চলমান। এটি সামরিক নীতিতে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত করতে পারে, যেখানে সেনাসদস্যদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
