মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ভূমধ্যসাগরে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা বৃহস্পতিবার শুরু
মার্কিন রণতরি ভূমধ্যসাগরে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা বৃহস্পতিবার

মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ভূমধ্যসাগরে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা বৃহস্পতিবার শুরু

মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষিতে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত সামরিক উপস্থিতি জোরদারের অংশ হিসেবে গত রোববার গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সুদা উপসাগরে পৌঁছেছে। জাহাজটির ডেকে সারিবদ্ধভাবে প্রস্তুত যুদ্ধবিমান দেখা গেছে। এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক উপস্থিতির অংশ, যা ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছে।

আলোচনা শুরুর আশা ও চুক্তির খসড়া প্রস্তুতি

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সত্ত্বেও ইরান আগামী বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরুর আশা করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত রোববার সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আবার শুরু হতে যাওয়া আলোচনার আগে একটি সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমার বিশ্বাস, সম্ভবত এই বৃহস্পতিবার জেনেভায় যখন আমরা আবার বসব, তখন আমরা সেই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে পারব এবং একটি ভালো খসড়া তৈরি করে দ্রুত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারব।’

মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি নিশ্চিত করেছেন যে বৃহস্পতিবার জেনেভায় আলোচনা শুরু হবে এবং চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বাড়তি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, আগের আলোচনা থেকে উৎসাহব্যঞ্জক সংকেত পাওয়া গেছে।

সামরিক হুমকি ও আত্মরক্ষার অধিকার

ইরানে বিক্ষোভ দমনে সরকারি অভিযানের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার হুমকি বহুগুণ বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ওই অভিযানে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। রোববারও ইরানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে আঞ্চলিক মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি আমাদের ওপর হামলা চালায়, তবে আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার আমাদের রয়েছে।’ তবে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের একটি ভালো সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।

যুদ্ধের আশঙ্কা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরি, যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য জাহাজ পাঠিয়েছে এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করেছে। ইরানি জনগণের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের আতঙ্ক বাড়ছে। তেহরানের বাসিন্দা হামিদ বলেন, ‘আমি রাতে ঘুমানোর ওষুধ খেয়েও শান্তিতে ঘুমাতে পারছি না।’ ৪৬ বছর বয়সী আইটি টেকনিশিয়ান মিনা আহমাদভান্দ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ হওয়াটা এখন অনিবার্য।

এই উদ্বেগের কারণে ভারত, সুইডেন, সার্বিয়া, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কিছু দেশ তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলে আমাদের আর কোনো যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। এখানে ইতোমধ্যে অনেক সংঘাত চলছে।’

অর্থনৈতিক চাপ ও বিক্ষোভ

ইরান মূলত মার্কিন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি চায়, যা দেশটির অর্থনীতি পঙ্গু করে দিয়েছে। গত বছরের শেষদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে দেশটিতে বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, কর্তৃপক্ষের কঠোর দমনে সেখানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। রোববারও ইরানি শিক্ষার্থীরা আবারও বিক্ষোভ মিছিলে জড়ো হন, স্থানীয় ও বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো তেহরানের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভের খবর দিয়েছে।

শুরুতে ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উৎসাহিত করেছিলেন এবং দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তাদের পক্ষে হস্তক্ষেপে হুমকি দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে তাঁর হুমকি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে মোড় নেয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনা ও সামরিক উত্তেজনা পাশাপাশি চলছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।