সম্ভলে মসজিদ জরিপ নিয়ে উত্তেজনা: পাঁচ প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনা
উত্তরপ্রদেশের সম্ভল শহরে একটি ঐতিহাসিক মসজিদের জরিপ কাজকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। আদালতের নির্দেশে মসজিদ জরিপের সময় আইনজীবী যখন ১৬শ শতকের শাহি জামে মসজিদের সরু গলি দিয়ে বের হচ্ছিলেন, তখন চারপাশে 'জয় শ্রীরাম' ধ্বনি দিচ্ছিলেন হিন্দু সমর্থকরা। অন্যদিকে, মসজিদ রক্ষায় জড়ো হওয়া মুসলিম জনতার মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই।
পুলিশি দমন ও প্রাণহানির করুণ চিত্র
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং গুলিবর্ষণের ঘটনায় কমপক্ষে পাঁচজন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ১৭ বছর বয়সী আয়ানও রয়েছেন। তার মা নাফিসা কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, 'এই ব্যবস্থা আর তাদের বপন করা ঘৃণা আমার ছেলেকে কেড়ে নিলো।' নিহতদের পরিবারগুলোর অভিযোগ, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ না করতে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি মসজিদের পক্ষে লড়াই করা আইনজীবীকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ইতিহাস বনাম আইনি লড়াইয়ের জটিল পরিস্থিতি
সম্ভলের শাহি জামে মসজিদটি মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে তাদের পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর দাবি, এটি একটি প্রাচীন মন্দিরের ওপর নির্মিত। এই প্রত্নতাত্ত্বিক দাবিকে ব্যবহার করে ২০২৪ সালের শেষের দিকে আদালতে আবেদন করেন আইনজীবী বিষ্ণু শঙ্কর জৈন। উল্লেখ্য, জৈনের বাবা ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের নেপথ্যের আইনি দলের সদস্য ছিলেন।
আদালতের আদেশ পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাতের অন্ধকারে শুরু হয় জরিপ কাজ। প্রশাসনের এই 'অস্বাভাবিক তৎপরতা' স্থানীয় মুসলিমদের মনে ভীতি ও সন্দেহের জন্ম দেয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এই ঘটনাকে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র থেকে 'হিন্দু' রাষ্ট্রে রূপান্তরের জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
ডিজিটাল নজরদারি ও বিচ্ছিন্নতার কৌশল
সংঘর্ষের পর সম্ভল শহরকে বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয় এবং পুলিশ প্রায় ২ হাজার ৭৫০ জন 'অজ্ঞাতপরিচয়' ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে। এই পদক্ষেপ স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এক নীরব হুমকি হিসেবে কাজ করে। ফোনের লোকেশন ডেটা ব্যবহার করে কয়েক ডজন মানুষকে আটক করা হয়, যা ডিজিটাল নজরদারির নতুন মাত্রা যোগ করে।
পুলিশ প্রধানের ভিন্ন চিত্র ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
সম্ভলের বদলে যাওয়া বাস্তবতার দৃশ্যমান মুখ হলেন পুলিশ প্রধান অনুজ চৌধুরী। কুস্তিগীর থেকে পুলিশ কর্মকর্তা হওয়া চৌধুরী ইনস্টাগ্রামে তার পেশিবহুল ছবি এবং ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের ভিডিও দিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তিনি সরাসরি বলেন, 'আগে মুসলিমদের তোষণ করার পুলিশি ব্যবস্থা ছিল, এখন আমরা শুধু আইন কার্যকর করছি।'
অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এই শহরকে তার 'স্ট্রংম্যান' ভাবমূর্তি গড়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। আগামী নির্বাচনে এটিই তার তুরুপের তাস হতে পারে। তার শাসনে প্রকাশ্য হিন্দু ধর্মীয় আচার এখন 'স্বাভাবিকতা' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, অন্য ধর্মের প্রকাশ সংকুচিত হচ্ছে।
সম্ভলের বদলে যাওয়া সামাজিক বাস্তবতা
সম্ভলের ৩ লাখ জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশই মুসলিম। কিন্তু এখন তাদের ধর্মীয় উৎসব বা প্রার্থনা ব্যক্তিগত পরিসরেই সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে। মসজিদের ঠিক পাশেই তৈরি করা হয়েছে বিশাল এক পুলিশ স্টেশন, যার দেয়ালে আঁকা হয়েছে মহাভারতের রণক্ষেত্রের দৃশ্য। গত জুলাইয়ে 'কানওয়ার যাত্রা' পালনের সময় মুসলিম পাড়ার ভেতর দিয়ে উচ্চশব্দে ডিজে বাজিয়ে মিছিল করা হয়।
স্থানীয় হিন্দু নেতা কান্তিক্রান্ত তিওয়ারি তৃপ্তির সাথে বলেন, 'আগে এসব এলাকা দিয়ে আমরা খুব ভয়ে ভয়ে যেতাম। এখন পরিস্থিতি বদলেছে।' ভারতের দুই বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ দেবেশ কাপুর এবং অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম তাদের নতুন বইতে লিখেছেন, 'ভারত এখন লেনদেনভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক গোঁড়ামির দিকে ধাবিত হচ্ছে।' সম্ভল শহর আজ সেই প্রাতিষ্ঠানিক গোঁড়ামির এক জীবন্ত গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় দাঙ্গার গল্প নয়, বরং এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। প্রশাসন, পুলিশ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা সম্পর্কের চিত্র এখানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সম্ভলের এই পরিস্থিতি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন তুলে ধরছে।
