র্যাবের ভবিষ্যৎ: নতুন আইন, পুরনো দায় ও রাজনৈতিক সঙ্কট
র্যাবের ভবিষ্যৎ: নতুন আইন, পুরনো দায় ও রাজনৈতিক সঙ্কট

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বাহিনীর বিলুপ্তির সুপারিশ করে আসছে। সম্প্রতি এই বাহিনী নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভ্যুত্থানের পর র‍্যাব বাহিনীর পক্ষ থেকে অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছিল, এমনকি বিএনপিও বিলুপ্তি দাবি করেছিল। কিন্তু বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, র‍্যাবের জন্য নতুন আইন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টাও বলেছেন, ‘র‍্যাব এক অর্থে সেভাবে থাকছে না, নামও সম্ভবত পাল্টাচ্ছে’। তবে নতুন আইনের রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়।

র্যাবের প্রতিষ্ঠা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস

সন্ত্রাস দমনের উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে র‍্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকেই র‍্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ার তথা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ২০০৬ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ র‍্যাবকে ‘বিচারক, জুরি ও জল্লাদ’ আখ্যায়িত করে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। আইন ও সালিশ কেন্দ্র তৎকালে ‘র‍্যাব: সন্ত্রাস নির্মূল নাকি রাষ্ট্রের সন্ত্রাস?’ নামে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

সে আমলে র‍্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কয়েকজন বিপথগামী কর্মকর্তার কাজ বলে দাবি করা যায় না। তৎকালীন মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতারা যেভাবে এর পক্ষে সাফাই ও সম্মতি উৎপাদন করেছিলেন, তা থেকে বোঝা যায় যে সরকারের প্রবল সম্মতি ও অনুমোদনের ভিত্তিতেই ‘ক্রসফায়ার’ করা হয়েছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছিল। যেমন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, ‘অপরাধীদের কোনো মানবাধিকার নেই।’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা হলে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি জানি না এমন দেশ পৃথিবীতে আছে কি না, যেখানে কিছু অপরাধীদের ক্রসফায়ারে মারা হয় না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আওয়ামী লীগের আমলে র্যাবের ব্যবহার

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো র‍্যাব বিলুপ্তির পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এই ‘হাতিয়ার’কে আরও ভয়ংকর ও নিখুঁত রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। ভাড়াটে বাহিনী হিসেবেও র‍্যাবকে ব্যবহারের নজির দেখা গেছে। বিএনপির কর্তাব্যক্তিরা যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করতেন, ঠিক একইভাবে লীগের কর্তাব্যক্তিরাও তা করতে দেখা গেছে।

এই নির্মম বাস্তবতা প্রমাণ করে যে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক হাতিয়ারগুলোর কেবল ‘হাতবদল’ হয়, চরিত্রের বদল হয় না। যে পক্ষ আগে বন্দুকের পেছনে ট্রিগারে আঙুল রেখে দাঁড়িয়ে ছিল, ক্ষমতার পরিবর্তনে তারাই এসে দাঁড়ায় নলের সামনে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, প্রতিটি শাসনামলই তার পূর্বতন আমলের ‘নিপীড়নমূলক’ হাতিয়ারকে কেবল বজায়ই রাখে না, বরং আরও প্রবলভাবে ব্যবহার করে।

বিএনপির বর্তমান অবস্থান ও সমালোচনা

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর র‍্যাব বাহিনীর পক্ষ থেকে জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়েছে। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারাও র‍্যাবের বিলুপ্তি চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বিএনপি র‍্যাবকে টিকিয়ে রাখার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী র‍্যাবের পদ্ধতিগত অপরাধকে ‘কয়েকজন কর্মকর্তার দোষ’ বলে হালকা করতে চাইছেন, যা ইস্যুটাকে গভীর দলীয় ও সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার ইঙ্গিত দেয়।

বিএনপি যদি মানবাধিকারের প্রশ্নে আন্তরিক হয়, তবে র‍্যাব বাহিনীর প্রতিষ্ঠা এবং ‘ক্রসফায়ার’কে পদ্ধতিগতভাবে চালু করার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দায় তাদের স্বীকার করতে হবে। পাশাপাশি র‍্যাবের কর্মকাণ্ডকে কেবল ‘দলীয়’ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা ত্যাগ করতে হবে। সম্প্রতি সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার র‍্যাবকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুরের পুনরাবৃত্তি করেছেন। তিনি বলেছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ভার নিয়ে শুধু র‍্যাবকে বিলুপ্ত করা যৌক্তিক সমাধান নয়। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ক্ষিপ্রতা, নজরদারি, পেশাদারির উৎকর্ষসম্পন্ন র‍্যাবের মতো একটি এলিট বাহিনীর আবশ্যকতা রয়েছে, তবে মানবাধিকারের দিকে নজর রাখতে হবে।

বিগত দুই দশকে র‍্যাবের রাষ্ট্রীয় ‘সন্ত্রাস’ ও এর ভয়াবহতাকে তিনি পর্যালোচনা করতে পারছেন না বলে মনে হয়। বাহিনীটির সূচনার ‘প্রশংসনীয় কাজ’ও ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজ। যে বাহিনী জন্মের পর থেকে পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে আসছে, তাদের ‘ক্ষিপ্রতা, নজরদারি, পেশাদারির উৎকর্ষ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা নাগরিকের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের সঙ্গে প্রতারণাপূর্ণ। অপরাধ দমনের জন্য ‘অপরাধী’র মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে হবে—এই পূর্বানুমানই র‍্যাবের পেশাদারির ‘উৎকর্ষ’ দাবির পূর্বানুমান হিসেবে কাজ করছে।

সামনের পথ

রাষ্ট্রের নাগরিকেরা একটি রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থান পার হয়ে এসেছে। দেড় দশকের ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার চক্র ভাঙতে হলে নির্মোহভাবে গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পর্যালোচনা করা দরকার। চব্বিশের আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতিক্রিয়াতেই। ইনসাফ কায়েম ও রিকনসিলিয়েশনের দীর্ঘমেয়াদি যাত্রার পথে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে র‍্যাবের কর্মকাণ্ডে বিএনপির পক্ষ থেকে নিজেদের রাজনৈতিক দায় স্বীকার করা। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতায় আসার আগে র‍্যাব বিলুপ্তির যে কথা বলা হয়েছিল, সেটাকে বাস্তবায়ন করা। ক্ষমতায় আসার আগে বিলুপ্তির কথা বলে এখন র‍্যাবের মতো পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বাহিনীকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি প্রদান সেই চিরচেনা সহিংসতার চক্রে আবারও জড়ানোর শঙ্কা তৈরি করছে। এই দীর্ঘ রাস্তা পার হয়ে এসেও যদি মানবাধিকারের পক্ষে অটল অবস্থান না নেওয়া যায়, তাহলে সেই অমোঘ বাণীই ইয়াদ করতে হয়, ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।