ইরানের শক্তি প্রদর্শন: হরমুজ প্রণালী সাময়িক বন্ধ, পারমাণবিক আলোচনা চলাকালীন উত্তেজনা
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা চলাকালীন এক বিরল শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জেনেভায় ওমানি দূতের বাসভবনে যখন দুই দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসেছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তেহরান এই ঘোষণা দেয়।
বিশ্বের তেল সরবরাহে প্রভাব
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সামরিক মহড়া এবং নৌ-নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েক ঘণ্টার জন্য এই প্রণালী বন্ধ রাখা হয়েছে। এই মহড়ায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী লাইভ মিসাইল বা তাজা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮০-র দশকের পর এই প্রথম ইরান আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি বন্ধ করার এমন ঘোষণা দিল।
ইরানি নেতৃত্বের হুঁশিয়ারি ও আশাবাদ
এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ওয়াশিংটনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিশ্বের শক্তিশালী সেনাবাহিনীও মাঝে মাঝে এমন চড় খেতে পারে যে তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিবৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, যুদ্ধজাহাজের চেয়েও বড় বিপদ হলো সেই অস্ত্র যা জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে।
তবে সামরিক এই মারমুখী অবস্থানের বিপরীতে ভিন্ন সুর শোনা গেছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির কণ্ঠে। জেনেভায় জাতিসংঘ নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছানোর জন্য একটি নতুন জানালা উন্মোচিত হয়েছে। তিনি এই আলোচনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যে কোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত।
মার্কিন প্রতিক্রিয়া ও সামরিক অবস্থান
এদিকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, আলোচনা কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক হয়েছে। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিছু রেড লাইন বা সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা ইরান এখনো মেনে নিতে রাজি নয়।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে ওই অঞ্চলে আগে থেকেই অবস্থান করা ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে এই বিশাল সামরিক বহর।
বিশ্ববাজারে প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই পাল্টাপাল্টি সামরিক অবস্থান এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধের সিদ্ধান্তে বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হলেও, আলোচনার খবর আসার পর দাম কিছুটা কমেছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরান যে বিস্তারিত প্রস্তাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা এই দীর্ঘদিনের পারমাণবিক অচলাবস্থা নিরসনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে।
এই ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে, যেখানে সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক আলোচনা একসাথে চলছে। ইরানের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে কাজ করছে, যা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং বিশ্বব্যাপী তেল বাজারের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
