মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে এশিয়ার শেয়ারবাজার পতন, তেলের দাম ৮০ ডলার ছাড়াল
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে এশিয়ার শেয়ারবাজার পতন, তেলের দাম বাড়া

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাবে এশিয়ার শেয়ারবাজারে টানা পতন, তেলের দাম বেড়ে ৮০ ডলার ছাড়াল

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রভাবে আজ বুধবার টানা তৃতীয় দিনের মতো এশিয়ার শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে। একই সময়ে জ্বালানি তেলের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

এশিয়ার শেয়ারবাজারে ব্যাপক অস্থিরতা

এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে আজ তীব্র অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। দিনের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক প্রায় ৬ শতাংশ নেমে যায়, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচকও ৩ শতাংশের বেশি পতন হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এই পতনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক উত্তেজনা, যা বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি, ব্রেন্ট ক্রুড ৮০ ডলার ছাড়াল

জ্বালানি তেলের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে, যা ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সরাসরি প্রভাব। গত দুই দিনের ঊর্ধ্বগতির পর আজ সকালে এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আরও প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে এই তেলের দাম অনেক দিন পর ৮০ ডলার পেরিয়ে গেছে। এই প্রতিবেদন লেখার সময় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮২ দশমিক শূন্য ১ ডলার। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি জাহাজে হামলার ঘটনায় আর্থিক খাতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু জাহাজে ‘আগুন ধরিয়ে দেওয়ার’ হুমকির পর ওই পথে চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা আগেই পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে, হরমুজ বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি তেলের দাম আবার ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের তেল ক্ষেত্রগুলোয় হামলা চালাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের মনে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রশ্ন তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ও নৌবাহিনীর ভূমিকা

গতকাল মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, প্রয়োজনে ওই অঞ্চল দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সুরক্ষা দেবে মার্কিন নৌবাহিনী। জ্বালানি সরবরাহে সংকট ঠেকাতে এবং বিশ্বে জ্বালানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে শিপিং কোম্পানিগুলোকে যুক্তিসংগত মূল্যে ঝুঁকি বিমা দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকেই শেয়ারবাজারে পতন চলছে। পাল্টা জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে, ফলে নৌপরিবহন ও বাণিজ্যিক বিমান পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির উপর প্রভাব

রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান—এই ভূরাজনৈতিক ধাক্কায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেননা, এ ধরনের সংকটে পণ্য পরিবহন ঝুঁকির মুখে পড়ে, যা উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা সৃষ্টি করে। বিনিয়োগকারীরা এখন মূল্যস্ফীতি ও সুদহারের পারস্পরিক প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, সেটিই বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন।

সোনার দামে পতন ও অন্যান্য বাজার

বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে এক খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অন্য লাভজনক খাত থেকে বেরিয়ে আসছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে রাতারাতি সোনার দাম প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ পড়ে গেছে। এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ১২৮ ডলারে স্থির হয়। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শেয়ারবাজারে আজ পতনের আশঙ্কা কমেছে। ফিউচার বাজারে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেখা গেছে। রয়টার্সের সংবাদে দেখা গেছে, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার প্রায় অপরিবর্তিত। অন্যদিকে ইউরোপীয় ফিউচার শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।

ডলারের শক্তি বৃদ্ধি ও ইউরোর পতন

আজ এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতে ডলার তিন মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা ইউরো থেকে সরে এসে ডলারের দিকে ঝুঁকেছেন। ফলে ইউএস ডলার ইনডেক্স (ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের শক্তি) শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৯৯ দশমিক ২৮৪-এ উঠেছে। গত ২৮ নভেম্বরের পর যা সর্বোচ্চ। ইউরোর দর শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমে ১ দশমিক ১৫৮১ ডলারে নেমে আসে। এ নিয়ে টানা তৃতীয় দিন ইউরোর পতন হলো। গতকাল প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইরানকে ঘিরে সংঘাত শুরুর আগেই ফেব্রুয়ারিতে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার তুলনায় বেশি ছিল। এই তথ্যের কারণেও ইউরোর ওপর চাপ বেড়েছে।