বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ানোর আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রভাব
বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ানোর আশঙ্কা

বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ানোর আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রভাব

বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৮০ মার্কিন ডলারের আশেপাশে অবস্থান করছে। রবিবার (১ মার্চ) দাম বেড়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি আগে থেকেই অনুমেয় ছিল, এবার সেই অনুমান বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

গত কয়েক দিনের দামের প্রবণতা

গত বছরের জুলাই মাসের পর থেকে গত শুক্রবার তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সে দিন প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৭৩ মার্কিন ডলারে ঠেকেছিল, যা একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক ছিল। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের বাজার নিয়ে ফিউচার ট্রেডিং এ সপ্তাহে বিশেষ কোনও কাজে আসবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক পণ্য বাজারের তথ্য ও দামের পূর্বাভাস প্রদানকারী সংস্থা আইসিআইএস-এর এনার্জি অ্যান্ড রিফাইনিং বিভাগের পরিচালক অজেয় পারমার বলেন, "সামরিক হামলা সরাসরি প্রভাব না ফেললেও হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকা তেলের বৈশ্বিক বাজারকে অস্থির করে তুলবে।" এই মন্তব্য বাজারের অনিশ্চয়তার মাত্রাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব ও বর্তমান অবস্থা

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের পথ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানের হুমকির পর বেশিরভাগ ট্যাঙ্কার মালিক, বড় তেল কোম্পানি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন স্থগিত করেছে। এই সিদ্ধান্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে এবং দাম বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে।

অজেয় পারমার আরও বলেন, "আশা করছি, সপ্তাহান্তে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি চলে যাবে। যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে দাম সেই স্তরও অতিক্রম করতে পারে।" এই পূর্বাভাস বাজারের উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে।

বিশ্লেষকদের মতামত ও সতর্কতা

আরবিসির বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফট বলেন, "ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ বা তারও বেশি হতে পারে বলে আগেই মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছিল।" এই সতর্কতা বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্বকে তুলে ধরে। এদিকে, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক প্লাস তেলের উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। রবিবার তারা জানায়, এপ্রিল থেকে দৈনিক দুই লাখ ছয় হাজার ব্যারেল তেল উত্তোলন করবে তারা। তবে, এই পরিমাণ খুবই সামান্য, যা বিশ্বব্যাপী চাহিদার মাত্র শূন্য দশমিক দুই শতাংশেরও কম। ফলে, এটি বাজারের চাপ কমাতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

বিকল্প অবকাঠামো ও সরবরাহের সম্ভাব্য ক্ষতি

স্বাধীন জ্বালানি গবেষণা এবং বিজনেস ইন্টেলিজেন্স ডেটা ফার্ম রাইস্টাড এনার্জির অর্থনীতিবিদ জর্জ লিওন বলেছেন, "যদিও হরমুজ প্রণালী এড়াতে কিছু বিকল্প অবকাঠামো ব্যবহার করা যেতে পারে, তবুও এর বন্ধ থাকার ফলে মোটামুটি ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক কাঁচা তেলের সরবরাহ হারাবে। এমনকি কিছু প্রবাহ সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন এবং আবুধাবির পাইপলাইনের মাধ্যমে বিকল্প পথে পরিচালিত হলেও এই ক্ষতি পূরণ করা কঠিন হবে।" রাইস্টাডের অনুমান অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ২০ ডলার করে বাড়তে পারে, যা ভোক্তাদের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি পরিস্থিতি স্থায়ী হয়, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে এবং জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।