হরমুজ প্রণালিতে শত শত জাহাজ আটকা, তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আটকা, তেলের দাম বাড়ার শঙ্কা

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার উদ্বিগ্ন

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালিতে মারাত্মক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জাহাজ চলাচলের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের দুই প্রবেশমুখে শত শত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী ট্যাংকার জাহাজ আটকা পড়ে আছে।

জাহাজ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্য

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিকের তথ্য বলছে যে অন্তত ১৫০টি বিশালাকার ট্যাংকার বর্তমানে হরমুজ প্রণালির বাইরে খোলা সমুদ্রে নোঙর করে অবস্থান করছে। এসব জাহাজের একটি বড় অংশ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি বহন করছে। প্রণালির অপর প্রান্তেও কয়েক ডজন জাহাজ স্থির হয়ে রয়েছে, যা পুরো অঞ্চলে জাহাজ চলাচলকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে।

হামলার পর যুদ্ধঝুঁকি ও জাহাজের অবস্থান

শিপিং বিশ্লেষকদের মতে, শনিবার সকালে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে অধিকাংশ জাহাজ ইরাক, সৌদি আরব ও কাতারের উপকূলসংলগ্ন এলাকায় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অপেক্ষা করছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে হামলার প্রতিক্রিয়ায় অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠায় জাহাজ মালিক ও কোম্পানিগুলো সতর্কতা অবলম্বন করছে।

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের জন্য দায়ী। এই সরু জলপথটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘চোকপয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচিত হয়। জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইন এখন গুরুতর ঝুঁকির মুখে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে যদি এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেতে পারে।

তেল কোম্পানিগুলোর সতর্কতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব

নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বেশ কয়েকটি শীর্ষ তেল কোম্পানি ও ট্রেডিং হাউস ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে কাতারের মতো এলএনজি রপ্তানিনির্ভর দেশ এবং সৌদি আরবের মতো শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশের রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা প্রণালির বাইরে অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোকে ‘ভাসমান তেলের পাহাড়’ হিসেবে বর্ণনা করছেন, যা বর্তমান সংকটের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য চাপ

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট শুধুমাত্র জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং পণ্য পরিবহন খরচেও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। যদি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা ইতিমধ্যেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে। তারা আরও যোগ করেন যে হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।