ইরানের সংকটে বাংলাদেশের বাণিজ্য: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার প্রভাব ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
ইরান সংকটে বাংলাদেশের বাণিজ্য: হরমুজ বন্ধে নতুন ঝুঁকি

ইরানের সংকটে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক: নতুন হুমকি ও সম্ভাব্য প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার ফলে ইরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে সংকটময় হয়ে উঠেছে। এই সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের বাণিজ্যের ওপরও পড়তে শুরু করেছে, যদিও ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ-ইরান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বর্তমান চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ এক কোটি মার্কিন ডলারের সামান্য বেশি। এই বাণিজ্যের প্রধান অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি, যেখানে ইরান থেকে আমদানি হয় নামমাত্র পরিমাণে। মাঝেমধ্যেই ইরান থেকে আমদানি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

ইপিবির তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ইরানে ১ কোটি ৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানির মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো:

  • পাটের সুতা: ১ কোটি ৮ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৮ ডলার
  • নিট পোশাক: ৯৫ হাজার ৩১০ ডলার
  • ওভেন পোশাক: ৯ হাজার ৩৫১ ডলার

গত কয়েক বছরের রপ্তানি প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে ইরানে রপ্তানি ছিল ১ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। পরবর্তী বছর তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৯ লাখ ডলারে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি বেড়ে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছালেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আবার কমে ১ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে নেমে আসে।

আমদানির হ্রাসমান প্রবণতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইরান থেকে বাংলাদেশে মাত্র ৫ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। এর আগের তিন বছর ইরান থেকে কোনো আমদানি হয়নি। ২০২০-২১ অর্থবছরে ইরান থেকে আমদানি হয়েছিল ৩ লাখ ডলারের পণ্য।

উল্লেখ্য, প্রায় এক দশক আগে ইরান থেকে বাংলাদেশের আমদানি কিছুটা বেশি ছিল। ২০১০-১১ অর্থবছরে ইরান থেকে ৪৪৯ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়েছিল। তবে পরবর্তী বছর থেকে এই আমদানি ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকে। ২০১১-১২ অর্থবছরে আমদানি কমে দাঁড়ায় ৯৯ কোটি টাকায়।

বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা ও শিল্প প্রতিনিধির মূল্যায়ন

নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের মিত্র দেশগুলোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে ব্যাংকিং লেনদেন অত্যন্ত জটিল। এছাড়া ইরান থেকে বাংলাদেশে ক্রেতারা তেমনভাবে আসেন না। ফলে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি তৈরি পোশাক কম যায়। তবে দুবাইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক ইরানে পৌঁছায়।'

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে মোহাম্মদ হাতেম সতর্ক করে বলেন, 'ইরানের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য কম হলেও বর্তমান যুদ্ধের পরোক্ষ ক্ষতি অনেক বেশি হবে। আমরা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।'

হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব ও পরিবহন সংকট

মোহাম্মদ হাতেম আরও ব্যাখ্যা করেন, 'হরমুজ খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাহাজে পণ্য পরিবহনের খরচ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেসব জাহাজ যায়, সেগুলো সাধারণত হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে। এখন সেই জাহাজগুলোকে ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগর ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।'

তিনি আরও যোগ করেন, 'মধ্যপ্রাচ্যে আকাশসীমা বন্ধ থাকায় কার্গো বিমান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। এতে জরুরি পণ্য রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও এলএনজি আমদানিও বাধাগ্রস্ত হবে। সব মিলিয়ে আমরা গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছি। সামনে আরেকটি বড় অর্থনৈতিক সংকট দেখতে পাচ্ছি আমরা।'

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে ইরান সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়লে বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানি উভয় খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।