ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত, কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু
ঈদুল ফিতরের পবিত্র সময়ে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত ১০ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। এই মর্মান্তিক পরিসংখ্যান সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রকাশ করেছে।
কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষ ও রাজবাড়ীতে বাস ডুবি
২১ মার্চ দিবাগত রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় একটি বাস রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় ট্রেনের সাথে সংঘর্ষে পড়ে। ট্রেনটি বাসটিকে অনেক দূর ঠেলে নিয়ে যায়, যাতে ১২ জন নিহত হন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে একটি বাস পড়ে ডুবে যায়, যাতে ২৬ জনের মৃত্যু হয়।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত দেশে ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত বছর ঈদুল ফিতরের ছুটির সময় ১১ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত হয়েছিলেন, অর্থাৎ এবার মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার তথ্য
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এর হিসাবে, ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ৭ দিনে ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন। তবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান মনে করেন, এবার সড়কে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাপনা ছিল না। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যাই বলে দিচ্ছে এবার ব্যবস্থাপনা কেমন ছিল। ব্যবস্থাপনা যেটুকু ছিল, সেটিও ভেঙে যাচ্ছে।”
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও সমাধান
পুলিশের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ। এই গবেষণা ২০২৪ সালে পুলিশ সদর দপ্তরের ‘রিসার্চ, প্ল্যানিং অ্যান্ড ইনোভেশন’ বিভাগ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ যৌথভাবে করেছিল।
গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঈদের সময় সড়কে গাড়ির বাড়তি চাপ থাকে, যা দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বাড়ায়। তাই ঈদের সময় সড়ক ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষকে বাড়তি নজর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
সড়ক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণগুলো বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এলেও, ব্যবস্থাপনাগত উদ্যোগের বদলে অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রকল্প নেওয়ার আগ্রহ বেশি দেখা গেছে। ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়ঝক্কড় যান চলাচল বন্ধ এবং যথাযথ লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন চালানো বন্ধে সমন্বিত ও নিয়মিত অভিযানের প্রয়োজন রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা
সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান এবং প্রায় ১০ হাজার মানুষ আহত হন। এই হিসাব শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়, হাসপাতালে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
তবে সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরাতে জোরালো উদ্যোগের অভাব রয়েছে। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো ও জরিমানা করা হলেও, পরিকল্পিত ও সমন্বিত কোনো কার্যক্রম চালানো হয় না। বিশেষজ্ঞরা সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত তদারকির উপর জোর দিচ্ছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা রোধ করা যায়।



