সুন্দরবনে বনদস্যুদের গুলিতে আহত বনজীবী আতিয়ার গাজীর জীবন সংগ্রাম
বনদস্যুদের গুলিতে আহত আতিয়ার গাজীর সুন্দরবন জীবনের ঝুঁকি

সুন্দরবনে বনদস্যুদের গুলিতে আহত বনজীবী আতিয়ার গাজী

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বনজীবী আতিয়ার গাজী (৬২) আজ মঙ্গলবার সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের কলাগাছিয়া মুল্লিখালে কাঁকড়া ধরার সময় বনদস্যুদের গুলিতে আহত হন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সঙ্গী কবির গাইন তাঁকে উদ্ধার করে বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনে নিয়ে আসেন এবং পরে সাতক্ষীরা শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিকেলে হাসপাতালের বাইরে কথা বলার সময় আতিয়ার গাজী বলেন, ‘বয়স যখন ১২-১৩, তখন থেকেই সুন্দরবনের জঙ্গলে যাচ্ছি। বাঘের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে এসেছি, কখনো ভয় পাইনি। কিন্তু এখন বাঘের চেয়েও ভয় লাগে বনদস্যুদের।’

চাঁদা না দেওয়ায় গুলিবিদ্ধ

আতিয়ার গাজী জানান, গত ২৯ মার্চ বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে পাস নিয়ে তিনি ও কবির গাইন সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। এর আগে দস্যু বাহিনী তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করেছিল, কিন্তু তিনি চাঁদা না দিয়েই বনে গিয়েছিলেন। আজ মঙ্গলবার সকালে বাড়ি ফেরার পথে বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’ সংকেত দিয়ে তাঁকে থামতে বলে, কিন্তু তিনি তা বুঝতে না পারায় হঠাৎ করেই তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়।

আতিয়ারের অভিযোগ, দুলাভাই বাহিনী তাঁর কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। অনেক অনুরোধ করে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে এর আগে একবার রক্ষা পেয়েছিলেন, কিন্তু এবার চাঁদা না দেওয়ায় তাঁকে গুলি করা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্ধশতক ধরে সুন্দরবনের ঝুঁকি

প্রায় অর্ধশতক ধরে সুন্দরবনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা চালিয়ে আসছেন আতিয়ার গাজী। জীবনের ঝুঁকি তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়। স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ২০০১ সালের এক রাতে ঝড়ের পর নদীতে চিংড়ি পোনা ধরতে গিয়েছিলেন কয়েকজন। ভোরের দিকে রান্নার জন্য কাঠ আনতে জঙ্গলে নামতেই হেতাল বনের ভেতর থেকে একটি বাঘ হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর ওপর। বাঘের থাবায় তাঁর কপাল ও কানে গুরুতর জখম হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আতিয়ার গাজী বলেন, ‘ভয় পাইনি। হাতে থাকা কুড়াল দিয়ে বাঘের মাথায় আঘাত করি। বাঘটা পিছু হটে, কিন্তু চলে যায় না। আধা ঘণ্টা দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। পরে অন্যদের ডাকাডাকি শুনে জঙ্গলের ভেতর চলে যায়।’ ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে প্রায় দুই মাস তিনি বাড়িতে ছিলেন, কিন্তু জীবিকার তাগিদে আবারও তাঁকে ফিরে যেতে হয়েছে জঙ্গলে।

পরিবারের সদস্যদেরও একই ভয়

আতিয়ারের পরিবারেও একই চিত্র দেখা যায়। তাঁর বড় ছেলে মাসুম বিল্লাহ প্রায় ২০ বছর ধরে সুন্দরবনে মধু, মাছ ও কাঁকড়া সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। মাসুম বিল্লাহ জানান, সুন্দরবনে এখন সবচেয়ে বড় ভয় বনদস্যু বাহিনী। দুলাভাই বাহিনী, জনাব বাহিনী, আলিম বাহিনী, নানা বাহিনী—এমন কয়েকটি দল সক্রিয় রয়েছে। চাঁদা না দিলে তারা ধরে নিয়ে নির্যাতন করে। গত বছর জনাব বাহিনীকে ২৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়েছিল, কিন্তু এবার কোনো সমঝোতা ছাড়াই বনে গেছেন তাঁরা।

মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘কপালে কী আছে, জানি না।’ বনজীবীদের অভিযোগ, সুন্দরবনে প্রবেশের আগে বনদস্যুদের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ না করলে জীবন নিয়ে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমনকি কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা গণমাধ্যমের কাছে এ বিষয়ে কিছু বললে পরে জঙ্গলে গেলে আরও ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হয়। জীবিকার তাগিদে তাঁদের প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জঙ্গলে যেতে হচ্ছে।