বরগুনায় হাসপাতালে শয্যা সংকট: শিশুদের মেঝেতে চিকিৎসা, হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক
বরগুনায় হাসপাতালে শয্যা সংকট, শিশুদের মেঝেতে চিকিৎসা

বরগুনায় হাসপাতালে শয্যা সংকট: শিশুদের মেঝেতে চিকিৎসা চলছে

বরগুনার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় শিশুদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতি জেলার স্বাস্থ্যসেবার মারাত্মক দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরেছে। গত সোমবার বিকেলে হাসপাতাল পরিদর্শনে দেখা যায়, হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে শয্যার অভাবে তারা মেঝেতে শুয়ে আছে, যা তাদের সুস্থতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নুজাইফার কাহিনী: হামের যন্ত্রণা ও চিকিৎসার সংগ্রাম

১১ মাস বয়সী নুজাইফার হাম ভালো হয়েছে কি হয়নি, তা এখনো নিশ্চিত নয় তার পরিবার। গত ফেব্রুয়ারিতে বরগুনা সদর হাসপাতালে তার হাম শনাক্ত হয়। এরপর তাকে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এখনো তার শরীরে লালচে দাগ আছে এবং মাঝেমধ্যে জ্বর হয়। গত সপ্তাহে দুবার তাকে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়েছে। নুজাইফাদের বাড়ি বরগুনা সদরের কড়ইতলা এলাকায়, যেখানে পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন এবং দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট।

নুজাইফার মা হাওয়া বেগম প্রথম আলোকে জানান, ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। এখন তার প্রথম মেয়ের বয়স ১৪ বছর, দ্বিতীয় মেয়ের বয়স ৭ বছর এবং সর্বশেষ মেয়ে নুজাইফার বয়স ১১ মাস। স্বামী ছোটখাটো ব্যবসা করেন এবং সংসারে টানাটানি নেই বলে দাবি করেন তিনি। তবে দুই মাসে নুজাইফার চিকিৎসায় ৮০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে, যা পরিবারের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

টিকা ও অপুষ্টির দ্বন্দ্ব

হাওয়া বেগম জানান না যে তিনি ছোটবেলায় হাম বা অন্যান্য রোগের টিকা নিয়েছিলেন কি না। তবে নুজাইফাকে ৯ মাস বয়সে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকা দেওয়ার আগে শিশুটি জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সদর হাসপাতালের ব্যবস্থাপত্রে দেখা যায়, শিশুটি হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। হাওয়া বেগমের মতে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর হাম দেখা দিয়েছে, তাই হাসপাতাল উৎস হতে পারে। আবার বড় দুই মেয়ের স্কুলের বার্ষিক খেলাধুলার অনুষ্ঠানে নুজাইফাকে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেটাও কারণ হতে পারে।

হাওয়া বেগম আরও জানান, নিজের শারীরিক সমস্যার কারণে দেড় মাস বয়সের পর শিশুটি বুকের দুধ পায়নি। বাজারের দুধই ভরসা ছিল। তবে চিকিৎসকেরা তাকে বলেছেন, শিশুটি অপুষ্টিতে ভুগছে এবং এই বয়সে যে ওজন থাকার কথা, তা নুজাইফার নেই। শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। বরগুনার কড়ইতলার এই শিশু ঠিক অপুষ্টির কারণে হামে আক্রান্ত হয়েছে নাকি হাসপাতালে সংক্রমিত হয়েছে, তা কেউ তলিয়ে দেখেনি।

বরগুনায় হামের উচ্চ হার: কারণ ও পরিসংখ্যান

বরগুনায় হামের রোগী বেশি। দেশের দক্ষিণের এই জেলায় এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের রোগী ১৮৪ জন এবং নিশ্চিত ৩৫ জন। বরগুনা সদরে রোগী শনাক্ত হয়েছে ২৬ জন। ইপিআইয়ের তথ্যমতে, এখানে প্রতি ১০ লাখে হাম সংক্রমণের হার ২৯৪ দশমিক ৫ জনের। দেশে আর কোথাও এমন হারে সংক্রমণ দেখা যায়নি। গত বছর এই জেলার মানুষ ব্যাপকভাবে ডেঙ্গুর সংক্রমণে পড়েছিলেন, এবার দেখা যাচ্ছে হাম। আলোচনায় সম্ভাব্য তিনটি কারণ উঠে আসে: অপুষ্টি, অসচেতনতা ও স্বাস্থ্য খাতে জনবলস্বল্পতা।

বরগুনা সমুদ্র উপকূলের জেলা, যেখানে কৃষি ও সমুদ্রে মাছ ধরাই মানুষের মূল পেশা। নারী অধিকারকর্মী হোসনে আরা হাসি বলেন, গ্রামে গ্রামে দারিদ্র্য বেশি এবং অপুষ্টি বেশি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইমিনেন্সের নির্বাহী প্রধান শামীম হায়দার তালুকদার বলেন, সর্বশেষ হিসাবে দেখা যায় জাতীয়ভাবে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৪ শতাংশ শিশু খর্বকায়, বরগুনায় সেই হার ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ। শিশু অপুষ্টির এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে বরগুনাতে অপুষ্টি জেঁকে বসে আছে।

জনবল সংকট: স্বাস্থ্যসেবার চরম দুরবস্থা

বরগুনা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অরুণাভ চৌধুরীর সই করা একটি হিসাবে দেখা যায়, সদর উপজেলায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মকর্তা–কর্মচারীর পদ আছে ১২০টি। এর মধ্যে পদ শূন্য ৫৫টি, অর্থাৎ ৪৬ শতাংশ পদই খালি। ২৫০ শয্যার বরগুনা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. রেজওয়ানুর রহমান বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৩৫০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকেন এবং দৈনিক বহির্বিভাগে রোগী আসেন গড়ে এক হাজার। কিন্তু হাসপাতালে জনবলের ঘাটতি ব্যাপক। তিনি বলেন, ‘এত কম জনবল দিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন। ডেঙ্গু ও হামের মতো প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।’

হাসপাতালের পরিসংখ্যান শাখার তথ্য অনুযায়ী, সদর হাসপাতালে সব ধরনের চিকিৎসকের পদ আছে ৫৫টি, যার ৩৬টিই খালি। অর্থাৎ ৬৫ শতাংশ পদে চিকিৎসক নেই। তৃতীয় শ্রেণির পদ আছে ৫২টি, যার ৩৬টি শূন্য। চতুর্থ শ্রেণির পদ আছে ২০টি, যার ১২টিই শূন্য। তবে নার্সদের ১০৭টি পদের মধ্যে ৪টি পদ শূন্য রয়েছে। বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, উপজেলা, সদর এবং সদর হাসপাতাল—সব ক্ষেত্রে জনবলসংকট মারাত্মক। হাম মোকাবিলা করতে হলে অতিসত্বর এই এলাকায় কিছু চিকিৎসক পদায়ন করা জরুরি।

সচেতনতা ও হাসপাতালে নিয়ন্ত্রণহীনতা

সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক বা উন্নয়নকর্মী অনেকেই বলেছেন, বরগুনার মানুষের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি আছে। গণমাধ্যমকর্মীরাও এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেননি। একটি এনজিওর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই জেলার কোনো কোনো অঞ্চলে বাল্যবিবাহ অনেক বেশি। একজন চিকিৎসক বলেন, আমতলী ও তালতলী উপজেলায় একধরনের মানুষ টিকার বিরুদ্ধে প্রচার–প্রচারণা করেন। কিছু মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীদের চেয়ে তাঁদের কথায় গুরুত্ব দেন বেশি।

প্রতিদিন হাসপাতালে শত শত মানুষ আসছেন–যাচ্ছেন। প্রত্যেক রোগীর সঙ্গে একাধিক দর্শনার্থী। শিশুর সঙ্গে মা–বাবাসহ আরও কাছের আত্মীয় থাকেন। হাসপাতালের বিভিন্ন তলায়, বারান্দায় রোগীর সঙ্গে আসা মানুষ বা আত্মীয় দেখা যায়। শিশুদের নিয়ে মানুষজন গাদাগাদি করে লিফটে ওঠানামা করছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে ভিড় সামলানোর কোনো ব্যবস্থা বা জনবল কর্তৃপক্ষের নেই। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলেন, হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় না থাকলে সুস্থ মানুষ হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থ হয় বা হাসপাতালে থেকে নতুন রোগ নিয়ে বাড়ি ফেরে। সারা বিশ্বে এটা স্বীকৃত যে হাসপাতাল থেকেও রোগজীবাণু ছড়ায়।

বরগুনা সদর হাসপাতালও এর ব্যতিক্রম নয়। গত পরশু একজন হামে আক্রান্ত ও চিকিৎসাধীন এক শিশুর নানি অভিযোগ করেছিলেন, তাঁরা শিশুটির জ্বর নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। ভর্তি থাকার পরে তার হাম দেখা দেয়। কড়ইতলার নুজাইফার মায়ের মনেও দ্বিধা আছে, সংক্রমণ হয়তোবা হাসপাতাল থেকে হয়েছে। তবে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. রেজওয়ানুর রহমান পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো মন্তব্য করতে আগ্রহ দেখাননি। শুধু বলেছেন, বাস্তবতা কী, তা আপনারা গতবার ডেঙ্গুর সময় দেখেছেন, এবার হামের সময় দেখছেন।

সমাধানের পথ: জনস্বাস্থ্যবিদের মতামত

বরগুনার মানুষ প্রকৃত কারণ জানতে চান। কেউ কেউ বলেছেন, গবেষণা হওয়া জরুরি। কেন বরগুনা হঠাৎ একাধিক রোগের ‘হট স্পট’ হয়ে উঠল, এর উত্তর পাওয়া যেমন দরকার, তেমনি সমস্যার সমাধানও প্রয়োজন। এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বরগুনার মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম, এটা মানতে আমি প্রস্তুত নই। সারা দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার যে দুর্বলতা, তা প্রকাশিত হয়েছে বরগুনায় ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্য দিয়ে। কেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিবর্তে আঞ্চলিক ব্যবস্থা থাকলে বরগুনায় জনবলসংকট হতো না। আজ যে সমস্যা বরগুনায় দেখা দিয়েছে, আগামীকাল তা অন্য কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় ঘটতে পারে। সুতরাং নতুন সরকারের উচিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারে হাত দেওয়া।’

এই পরিস্থিতি বরগুনার স্বাস্থ্যসেবার জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে শিশুদের মেঝেতে চিকিৎসার মতো করুণ দৃশ্য আর না দেখা যায় এবং হামের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।