রাজশাহী মেডিকেলে হামে ৪০ শিশুর মৃত্যু, বিশেষ ওয়ার্ড চালু
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত রোগীদের জন্য একটি বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সম্প্রতি হাম উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে।
শিশু মৃত্যুর করুণ পরিসংখ্যান
গত তিন মাসে হাসপাতালটিতে হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ৪০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জানুয়ারি মাস থেকে এই উপসর্গে শিশু মৃত্যু শুরু হলেও, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। গত শনিবার হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস প্রথমবারের মতো গত তিন মাসে ৩৮ শিশুর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেন। রোববার দুই শিশুর মৃত্যু নিয়ে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে।
মিডিয়া প্রতিবেদন ও কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ
গত ২৬ মার্চ প্রথম আলোতে ‘রাজশাহী মেডিকেল/ আইসিইউর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ১১ দিনে ৩৩ শিশুর মৃত্যু’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে দেশব্যাপী আলোচিত হয়। ২৮ মার্চ প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘রাজশাহী মেডিকেলে ছোঁয়াচে হামের রোগীদের রাখা হচ্ছে সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেদিনই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন শিশুদের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে একটি অনুষ্ঠানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হামের রোগীদের জন্য বিশেষায়িত ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করে।
তথ্য প্রকাশ ও হালনাগাদ প্রক্রিয়া
গত ৩১ মার্চ রাজশাহী মেডিকেলে এসে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী। সেই দিন থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর তথ্য দিতে শুরু করে। সেদিন বলা হয়েছিল নমুনা পরীক্ষায় হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে, এমন একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবারের আগের দিন পর্যন্ত তারা পাঁচজন শিশুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছিল। এর পর থেকে প্রতিদিন দুপুরে হাম রোগীদের তথ্য হালনাগাদ করে গণমাধ্যমকে জানানো হচ্ছে।
আক্রান্ত পরিবারের করুণ গল্প
গত শুক্রবার বিকেলে হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ মাস বয়সী শিশু সোনিয়ার মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায়। তাকে নিয়ে তার পরিবার প্রায় এক মাস রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছিল। মৃত্যুর চার দিন আগে শিশুটিকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। তবু তাকে বাঁচানো যায়নি। সোনিয়ার বাবা সজীব আহমেদ জানান, তাঁর মেয়ের সর্দি-কাশি নিয়ে গত ৭ মার্চ এই হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। হাসপাতালে আসার পর তাঁর মেয়ের গায়ে হাম উঠেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার রাহাত নামের একটি শিশু শনিবার সকাল ছয়টার দিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। বাচ্চাটির বয়স ছিল ৮ মাস ১১ দিন। গত ১৭ মার্চ বাচ্চাটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। রাহাতের বাবা রায়হান জানান, এর পর থেকে বাচ্চার এক দিনের জন্য জ্বর যায়নি। হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন থাকার সময় তাঁর বাচ্চার গায়ে হাম উঠেছে। তিনি ওই ওয়ার্ডের নার্সের স্বল্পতা এবং দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ করেন।
হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ তথ্য
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১ মার্চ থেকে গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) পর্যন্ত হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে গুরুতর অসুস্থ ৮৪ জন শিশুকে সাধারণ ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে স্থানান্তরের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। তার মধ্যে আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়ার পরেও ৯ জন শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।



