ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে জাপান স্টাডি ক্লাবের উত্থান: জ্ঞান ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন
ঢাবিতে জাপান স্টাডি ক্লাব: জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্ল্যাটফর্ম

ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে জাপান স্টাডি ক্লাবের উত্থান: জ্ঞান ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের করিডরে প্রায়ই জাপানের ভাষা, ইতিহাস, কূটনীতি এবং অ্যানিমে নিয়ে আলোচনার শব্দ শোনা যায়। এই আলোচনাগুলোকে একটি সংগঠিত রূপ দিয়েছে তরুণ উদ্যোগ জাপান স্টাডি ক্লাব। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি বিনিময়, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি প্রাণবন্ত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য

প্রায় সাড়ে তিন বছর অনানুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম চালানোর পর, বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সিলমোহরে ক্লাবটির আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয় ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। কাকতালীয়ভাবে ১৯৭২ সালের এই তারিখেই বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। এই প্রতীকী সাদৃশ্য দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ঐতিহাসিক ধারাকে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

লক্ষ্য ও প্রেরণা: একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়

জাপান স্টাডি ক্লাবের বিশেষত্ব হলো একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক—দুই ধারাকেই একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা অধ্যয়ন ও তুলনামূলক রাজনীতি শেখেন, যার বাস্তব উদাহরণস্বরূপ জাপানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জাপানের ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, উন্নয়নধারা, গণতান্ত্রিক কাঠামো, ভাষা, সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজভাবে তুলে ধরার লক্ষ্য থেকেই ক্লাবটির সূচনা। আশরাফুল বিন শফি রাব্বীর নেতৃত্বে নুসরাত, নোমান, তালবিয়া, মীম, ফাহিম, মাহিন, সিজরাতসহ আরও অনেক স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই সংগঠন শুরুতে সদস্যসংখ্যায় ছোট হলেও চিন্তায় ছিল বৃহৎ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দ্রুত অগ্রযাত্রা ও সাফল্যের ধারা

অল্প সময়ের মধ্যেই জাপান স্টাডি ক্লাব শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া সৃষ্টি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপান নিয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা বহু বছর ধরেই নানা কার্যক্রমে যুক্ত থাকলেও সেগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন ও অপ্রাতিষ্ঠানিক। সেই অভাব পূরণ করেই সংগঠিত একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এই ক্লাব।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রায় ৪৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ২৫০ জন ক্লাবটির সক্রিয় সদস্য। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রায় এক শর বেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ ক্লাবের কার্যক্রমকে প্রাণবন্ত করে তোলে। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে খুব দ্রুতই এটি বিভাগের একটি শক্তিশালী একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

এ ছাড়া ক্লাবটির ফেসবুক পেজে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার অনুসারী ও দেড় মিলিয়ন ভিউ রয়েছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগসহ বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এখানে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে ক্লাবে সদস্যদের প্রদত্ত পদবি ও পোর্টফলিওগুলো অনুপম-অদ্বিতীয় হওয়ায় শিক্ষার্থীরা খুব উৎসাহসহকারে ক্লাবে যোগদান করছেন।

একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সমৃদ্ধি

জাপান স্টাডি ক্লাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সমন্বয়। প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই ক্লাবটি আয়োজন করেছে:

  • ল্যাঙ্গুয়েজ কার্নিভাল
  • জাপানভিত্তিক পাবলিক লেকচার
  • অ্যানিমে ও পপ কালচার সেশন
  • জাপানের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা
  • ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেশন
  • স্কলারশিপ ও এক্সচেঞ্জ–সংক্রান্ত কর্মশালা
  • জাপানের উন্নয়ন মডেল নিয়ে গবেষণা আলোচনা

এর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম হিসেবে আয়োজন করা হয়েছে অরিগ্যামি কর্মশালা, ইকেবানা বা জাপানি ফুল সাজানোর শিল্পের প্রদর্শনী, জাপানি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং জাপানি পপ কালচার–বিষয়ক আলোচনা। এসব আয়োজন শিক্ষার্থীদের জাপানের সমাজ ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানার সুযোগ করে দেয়।

ক্লাবের সদস্যদের অনেকেই জাপানি ভাষা ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার অর্জন করেছেন। কেউ ভালো সিজিপিএ নিয়ে ‘চেয়ার্স অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। এ ছাড়া জাপানের দূতাবাস আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও কার্যক্রমে অংশ নিয়ে পুরস্কার অর্জনের উদাহরণও রয়েছে। দূতাবাসের প্রতিনিধিরাও নিয়মিতভাবে ক্লাবের প্রায় সব আয়োজনে উপস্থিত থেকে আগ্রহভরে কার্যক্রমসমূহ পর্যালোচনা করছেন এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য ও উৎসাহ দিচ্ছেন।

সহযোগিতামূলক পরিবার ও আন্তর্জাতিক সংযোগ

জাপান স্টাডি ক্লাব শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি একটি শেখার ও সহযোগিতার পরিবার। এখানে সিনিয়র ও জুনিয়র শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শেখার একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সিনিয়র শিক্ষার্থীরা জুনিয়রদের জাপানি ভাষা শেখানো, টার্ম পেপার লেখার কৌশল বোঝানো এবং গবেষণামূলক কাজের দিকনির্দেশনা দেওয়ার মাধ্যমে সহায়তা করছেন।

ক্লাবটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক সুযোগ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। JENESYS প্রোগ্রাম, MEXT স্কলারশিপ, JICA প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

ইতিমধ্যে ক্লাবের দুজন সদস্য (রাব্বী-সান ও নোমান-সান) জাপান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নির্বাচিত হয়ে জাপান ভ্রমণ করেছেন। অনেকেই বিভিন্ন সময়ে জাপানের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও থিঙ্কট্যাংকে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

শুরুর সময় ক্লাবটির সামনে ছিল নানা সীমাবদ্ধতা। সম্পদের অভাব, নির্দিষ্ট জায়গার অভাব এবং স্বেচ্ছাশ্রমের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ধারাবাহিক আয়োজন, প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম এবং সদস্যদের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে খুব দ্রুতই ক্লাবটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

জাপান স্টাডি ক্লাব ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিসরে একাডেমিক, গবেষণামূলক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। ইতিমধ্যে ক্লাবের পক্ষ থেকে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার নাম ‘তোমোদাচি’ (ともだち)। জাপানি ভাষায় এর অর্থ ‘বন্ধু’। ম্যাগাজিনটির নামকরণ করেছেন জাপানি কূটনীতিক ইয়ামামোতো কিওহেই-সান।

বর্তমানে ক্লাবটির সভাপতি নোমান-সান এবং সাধারণ সম্পাদক তালবিয়া-সান। তাঁরা জানিয়েছেন, ক্লাবটির সূচনা হয়েছিল একটি ছোট স্বপ্ন থেকে, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা একটি বৃহৎ প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক রাব্বী-সান জানান, ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমিক পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে গবেষণা জার্নাল প্রকাশ, ক্যারিয়ার উন্নয়নমূলক কর্মসূচি আয়োজন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং স্কলারশিপ ও এক্সচেঞ্জ সুযোগ আরও সম্প্রসারণ।

প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন ও শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আলী আশরাফ ক্লাবটির কার্যক্রমে গভীর আগ্রহ ও সমর্থন প্রদান করছেন। তাঁর লক্ষ্য হলো এই ক্লাবের মাধ্যমে বিভাগের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও সক্রিয় করে তোলা এবং বিভাগকে জাতীয় পর্যায়ে আরও পরিচিত করে তোলা।

ক্লাবটির প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে বিভাগের আরও কয়েকজন শিক্ষকের অবদান উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনছারুল আলম, ড. সাইমা আহমেদ এবং কবি ও কূটনীতিক জনাব মুজতবা মুরশেদ বিভিন্ন সময়ে দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ প্রদান করেছেন।

এ ছাড়া ঢাকার জাপান দূতাবাসের সমর্থন ক্লাবটির কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে। দূতাবাসের কর্মকর্তা কেন কোমিনে-সান, ইয়ামামোতো কিওহেই-সান এবং কাজী বুশরা আহমেদ তিথি-সান বিভিন্ন সময় সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংগঠনটির পাশে থেকেছেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ক্লাবটির অধিকাংশ কার্যক্রমই শিক্ষার্থীদের নিজস্ব উদ্যোগ ও অর্থায়নের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা তাঁদের দায়িত্ববোধ, স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সংগঠনটির প্রতি আন্তরিকতারই প্রতিফলন।

শেষ কথা: নতুন দিগন্তের সূচনা

অল্প সময়ের পথচলাতেই জাপান স্টাডি ক্লাব দেখিয়েছে যে একটি স্বপ্ন, কিছু নিবেদিত মানুষ এবং জ্ঞানচর্চার আন্তরিকতা থাকলে একটি সংগঠন কত দ্রুত শিক্ষার্থীদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জাপানের সংস্কৃতি, চিন্তাধারা এবং উন্নয়ন অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ক্লাব আজ শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন এক আন্তর্জাতিক দিগন্ত উন্মোচন করছে। একটি দেশের সংস্কৃতি জানার মাধ্যমে আরেকটি বিশ্বের দরজা খুলে যায়। সেই দরজা খুলে দেওয়ার কাজটিই করে চলেছে জাপান স্টাডি ক্লাব।