কক্সবাজারে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডে নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান
মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি যুদ্ধের নাম নয়, এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও আত্মত্যাগের গৌরবময় ইতিহাস। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা আজও জাতির অহংকারের প্রতীক হিসেবে বিরাজ করছে। সময়ের প্রবাহে নানা ব্যাখ্যা ও বিকৃতির প্রচেষ্টা থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, তাৎপর্য ও মূল্যবোধ তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬-এর আয়োজন
৩১ মার্চ দুপুরে কক্সবাজারের বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মিলনায়তনে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানকে সামনে রেখে এই আয়োজন করে কক্সবাজার বন্ধুসভা। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কক্সবাজার জেলা ইউনিটের আহ্বায়ক এম রুহুল আমিন মুকুল। তিনি তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ঘটনাবলি ও চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া না হলে জাতি বিভ্রান্তির শিকার হতে পারে।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. ছৈয়দ করিম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সের মহাপরিচালক এম এম সিরাজুল ইসলাম। তিনি তার বক্তৃতায় উল্লেখ করেন, ‘তরুণ প্রজন্ম যদি সঠিক ইতিহাস না জানে, তাহলে দেশপ্রেমের মূল্যবোধ হারিয়ে যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ ও এর ইতিহাসকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখা উচিত নয়।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। শহীদ সুভাষ, ফরহাদসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা তাদের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, শত শত মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন। সেই মহান ত্যাগের ইতিহাস কখনোই মুছে ফেলা সম্ভব নয়।’
কক্সবাজারের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আব্দুল কুদ্দুস রানা অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন, ২৬ মার্চ সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলেও কক্সবাজারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আগমন ঘটে ৫ মে। পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সুবহানের নেতৃত্বে কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে এবং ১২ ডিসেম্বর কক্সবাজার সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত হয়।
মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড কুইজ প্রতিযোগিতা ও বিজয়ী ঘোষণা
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কক্সবাজার বন্ধুসভার সভাপতি আবদুল নবী ও সাধারণ সম্পাদক উলফাতুল মোস্তফা। এই আয়োজনের অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। সর্বোচ্চ নম্বরের ভিত্তিতে পাঁচজন বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়। বিজয়ীদের তালিকা নিম্নরূপ:
- প্রথম স্থান: নুসহাত রহমান
- দ্বিতীয় স্থান: আরাওয়া সুলতানা
- তৃতীয় স্থান: আরিফ আদনান
- চতুর্থ স্থান: আফরা রাইহানা
- পঞ্চম স্থান: রাইশা জান্নাত
বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মূল্যবান বই পুরস্কার হিসেবে তুলে দেন অনুষ্ঠানের অতিথিরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ
এই বিশেষ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার বন্ধুসভার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারগোব মূর্শেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক উগ্য মারমা, প্রচার সম্পাদক ইশরাফ উদ্দিন, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক আয়েশা ছিদ্দিকা, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক মুবিনুল ইসলাম, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক ফাহিম ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক আল আমিন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পাদক ইকবাল হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য রাউজাতুল মোস্তফা, সানজেনা দ্দৌজা, উম্মে সামিরা, সদস্য সাউদা ফাইজিয়া, মোহাম্মদ জিহাদ, ইশরাক হোসেন, রাকিব হাসান, রেশমি আক্তার, মিনহাজুল ইসলাম ও আসিফুর রহমানসহ বন্ধুসভার অন্যান্য সদস্যরা।
সভাপতি মো. ছৈয়দ করিম তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার চেতনা ধারণ করে একটি সুন্দর ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আজকের তরুণ প্রজন্মকে সচেতন ও জাগ্রত থাকতে হবে। এই অনুষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চেতনা প্রসারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।



