নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত: সহকারী স্টেশন মাস্টার বরখাস্ত, তদন্ত চলছে
বগুড়ার সান্তাহার জংশনের অদূরে বাগবাড়ি এলাকায় নীলসাগর এক্সপ্রেসের নয়টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সান্তাহার স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার শহিদুল ইসলাম রঞ্জুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পাশাপাশি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। রাতে বরখাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সান্তাহার রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার খাদিজা খাতুন।
দুর্ঘটনার কারণ ও তদন্ত
খাদিজা খাতুন বলেন, ‘তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ বলা সম্ভব নয়। তবে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সহকারী স্টেশন মাস্টার শহিদুল ইসলাম রঞ্জুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।’ তবে প্রত্যক্ষদর্শী সান্তাহার জংশন স্টেশনের অধীনে দায়িত্বে থাকা ওয়েম্যান সোহেল জানান, চালক সংকেত অমান্য করার কারণে এবং চালকের ভুলে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আহাম্মেদ হোসেন মাসুম চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটি উদ্ধারে পার্বতীপুর ও ঈশ্বরদী থেকে দুটি উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে এসেছে।
যাত্রীদের ভোগান্তি ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
বেলা আড়াইটার দিকে সান্তাহার জংশনের অদূরে বাগবাড়ি এলাকায় নীলসাগর এক্সপ্রেসের বগিগুলো লাইনচ্যুত হয়। এরপর থেকে ওই লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। তিনটি স্টেশনে আটকা পড়েছে অন্তত পাঁচটি ট্রেন। রাত ১১টা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি, যার ফলে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকে বিভিন্ন যানবাহনে গন্তব্যে গেছেন।
রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় তিনটি স্টেশনে ঈদযাত্রার ৫টি ট্রেন আটকা পড়েছে। আজ রাত ২টা নাগাদ লাইনচ্যুত ট্রেনটি উদ্ধার হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের আরও কয়েক জোড়া ট্রেন আটকা পড়তে পারে। ঘটনার পর উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলা নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাটের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
আটকে পড়া ট্রেনের তালিকা
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় রেল কন্ট্রোলার শফিকুর রহমান জানান, ঘটনার পর থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ঈদযাত্রার তিনটি ট্রেন আটকা পড়েছে।
- পঞ্চগড় থেকে রাজশাহীগামী বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে
- খুলনা থেকে চিলাহাটিগামী রূপসা এক্সপ্রেস নাটোরের রানীনগরে
- খুলনা থেকে পার্বতীপুরগামী রকেট মেইল নাটোরে
- ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেস নাটোরের আবদুলপুর স্টেশনে
- রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী বরেন্দ্র এক্সপ্রেস আবদুলপুর স্টেশনে
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজিব কায়সার বলেন, ‘লাইনচ্যুত ট্রেনটি উদ্ধার করতে রাত ২টা বাজতে পারে। এতে আরও কয়েক জোড়া ট্রেন আটকা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দ্রুত লাইন চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।’
দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
রেলওয়ে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদকে সামনে রেখে ট্রেনটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি যাত্রী ছিল। সান্তাহার স্টেশনের অদূরে বাগবাড়ি এলাকায় রেললাইনের মেরামতের কাজ চলছিল। নিয়ম অনুযায়ী কন্ট্রোল রুম থেকে সতর্ক সংকেত দেওয়া হয় এবং লাইনের উভয় পাশে লাল পতাকা টাঙানো ছিল। কিন্তু ট্রেনের চালক সিগন্যাল, লাল ব্যানার এবং কর্মীদের হাতের সংকেত উপেক্ষা করে দ্রুতগতিতে ট্রেনটি মেরামতাধীন লাইনে প্রবেশ করান। এতে বিকট শব্দে পাওয়ার কারসহ নয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়।
স্থানীয়রা জানান, দুর্ঘটনার সময় ট্রেনটির গতি ঘণ্টায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার ছিল। লাল পতাকার স্থানে গতি কমানো হয়নি। ট্রেনের ছাদে থাকা অনেক যাত্রী নিচে পড়ে আহত হন।
আহতদের চিকিৎসা ও পুলিশি তদন্ত
আহতদের উদ্ধার করে আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও নওগাঁ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নওগাঁ সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মহসিন জানান, তাদের হাসপাতালে ৫০ জনের বেশি আহত যাত্রী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২০ জনের হাত-পা ভাঙা ও মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন তিনি।
সান্তাহার রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান বলেন, ‘খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে দ্রুত রেললাইন সচল করার কাজ চলছে।’
