মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান ধর্মঘট: এসআইআর ভোটার তালিকা নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সমন্বিত নিবিড় ভোটার তালিকা বা এসআইআরের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেছেন। গতকাল শুক্রবার দুপুর থেকে কলকাতার কেন্দ্রস্থল ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে এই ধর্মঘটের সূচনা হয়েছে, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৃঢ় অবস্থান এই ইস্যুতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
ভোটার তালিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, এসআইআরের নামে বহু প্রকৃত ভোটারকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বহু জীবিত ভোটারকে মৃত দেখানো হয়েছে, যা ভোটার তালিকা নিয়ে নয়ছয় করার একটি চক্রান্ত বলে তিনি মনে করেন। ধর্মতলার অবস্থান মঞ্চ থেকে মমতা গতকাল বলেন, ‘নির্লজ্জ বেহায়া বিজেপি। আর তাদের দালাল হলো নির্বাচন কমিশন। এ লজ্জা আজ ঢাকার জায়গা নেই। বেঁচে আছেন ভোটার অথচ দেখানো হয়েছে মৃতের তালিকায়।’ তিনি এই ধরনের মৃতের তালিকায় থাকা ২২ জন জীবিত ভোটারকে সশরীরে অবস্থান মঞ্চে হাজির করান, যা তার অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের বিশদ অভিযোগ
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আরও বিশদ অভিযোগ উঠে এসেছে। দলটির দাবি অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রায় ৬৪ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এই বাদ দেওয়া তালিকার বেশির ভাগ ভোটারই পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম অধ্যুষিত মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর জেলার বাসিন্দা। এই ঘটনা রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।
সমর্থনে যোগ দিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা
এই অবস্থান ধর্মঘটে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও যাদবপুরের সাবেক সংসদ সদস্য কবীর সুমন যোগ দেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনেপ্রাণে তৃণমূল নই। অভিযোগ আছে। তবে এটাও ঠিক এতদিন এই রাজ্যের উন্নয়নের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে কাজ করেছেন তা তুলনাহীন।’ এরপর উপস্থিত মানুষের অনুরোধে তিনি ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ এবং ‘পথে এবার নামো সাথী’ গান দুটি গেয়ে শোনান, যা ধর্মঘটের পরিবেশে আবেগময় মুহূর্ত সৃষ্টি করে।
রাজ্যসভা প্রার্থী ও নেতাদের উপস্থিতি
এই অবস্থান ধর্মঘটে আরও যোগ দেন এবারের রাজ্যসভার নির্বাচনে তৃণমূলের ৪ প্রার্থী। তাদের মধ্যে রয়েছেন আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার, অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক এবং সংগীতশিল্পী বাবুল সুপ্রিয়। তাদের উপস্থিতি ধর্মঘটের গুরুত্ব ও ব্যাপকতা বাড়িয়ে তুলেছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যদ্বাণী
অবস্থান ধর্মঘটে যোগ দিয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এবারের বিধানসভা ভোটে বিজেপির আসনসংখ্যা ৫০–এর নিচে চলে যাবে। তবে বিজেপি ৪০–এর নিচে আসন পেলে আশ্চর্য হওয়ার কারণ থাকবে না। অবাক হব না।’ তার এই মন্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনার সৃষ্টি করেছে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে অনুমানকে উসকে দিয়েছে।
মোটকথা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অবস্থান ধর্মঘট পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন মোড় দিয়েছে। ভোটার তালিকা নিয়ে এই বিতর্ক কেবল রাজ্যেই নয়, জাতীয় পর্যায়েও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ধর্মঘটের মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার দলের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এবং ভোটার অধিকার রক্ষার লড়াইকে জোরদার করেছেন।
