নীরব ভোটারদের হাতে এবারের নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ
বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচন একেবারেই ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে, বিশেষত এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের পর ভোটের সমস্ত হিসাব-নিকাশে আমূল পরিবর্তন এসেছে, যেখানে তরুণ ভোটাররা জয়-পরাজয়ের সমীকরণ সম্পূর্ণরূপে বদলে দিতে সক্ষম বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
নীরব ভোটারদের উত্থান
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে নীরব ভোটারদের ভূমিকা। তরুণ, নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক ভোটার প্রকাশ্যে কোনো দল বা জোটের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে নীরব ভূমিকায় রয়েছেন। তারা ভোটকক্ষের গোপন বুথে ব্যালটে সিল মেরে তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন, ফলে এই নীরব ভোটাররাই শেষ মুহূর্তে জয়-পরাজয়ের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করবেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তারা যে দল বা প্রার্থীকে ভোট দেবেন, তাদের বিজয়ের পাল্লাই ভারী হবে।
আওয়ামী লীগের নীরব উপস্থিতি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটার পর দলটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় এবারের নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিতে পারছে না। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাসহ বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় নেতা এবং সাবেক এমপি-মন্ত্রী হয় পলাতক নয়তো কারাগারে। মাঝে-মধ্যে দু-চারটি ঝটিকা মিছিল এবং অনলাইনে সক্রিয়তা ছাড়া মাঠের রাজনীতিতে দলটি সক্রিয় নেই বললেই চলে। তাদের তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও হামলা-মামলায় জর্জরিত হয়ে নীরবেই সময় কাটাচ্ছেন। যদিও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভোট বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে, তবুও কিছু কিছু জায়গায় স্থানীয় প্রার্থীদের পক্ষে দলটির নেতাকর্মীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন। স্থানীয় রাজনীতিবিদরা মনে করছেন, মাঠে সক্রিয় না থাকলেও আওয়ামী লীগের ভোট গুরুত্বহীন হয়ে যায়নি, বরং ভোটের মাঠে তাদের কদর বেড়েছে কারণ তাদের নীরব ভোটই ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক প্রভাব
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা এখন প্রায় পাঁচ কোটি, যা মোট ভোটারের একটি বিশাল অংশ। এই তরুণ প্রজন্ম আগামীর ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রধান 'কিংমেকার' হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। এসব নতুন ভোটারের বড় একটি অংশ দলীয় রাজনীতির বাইরে অবস্থান করায় তাদের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে তা আগে থেকে বলা কঠিন। তারা রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে এলাকার উন্নয়ন, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, ক্লিন ইমেজের প্রার্থী এবং প্রার্থীর মাঠপর্যায়ের উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা এই নতুন ভোটাররা শেষ মুহূর্তে যে প্রার্থীর দিকে ঝুঁকবেন, সেই প্রার্থীর বিজয় সহজ হবে।
নারী ভোটারদের কৌশলগত গুরুত্ব
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটারের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ছয় কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে তৃণমূলের নারীদের বড় একটি অংশ সরাসরি কোনো দলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত নয়, ফলে ভোটের হিসাবে যেকোনো আসনের নির্বাচনে নারী ভোটারদের বড় অংশকে পক্ষে আনতে পারলেই বিজয় সুনিশ্চিত করা যায়। এমন চিন্তা থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা নারী ভোটারদের পক্ষে আনতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দলীয় ইশতেহার ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতেও আলাদাভাবে নারীদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংখ্যালঘু ভোটারদের ভূমিকা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন আলাদা করে হিসাব না করলেও বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য মতে, দেশে এক কোটির উপরে সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। কিছু কিছু আসনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের, এমনকি কোনো কোনো আসনে এই সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা নির্দিষ্ট কোনো দলের নয়, প্রায় সব দলেই তাদের নেতাকর্মী ও সমর্থক রয়েছেন। এছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ রাজনীতিতে সক্রিয় নয়, ফলে তারাও নীরবে শেষ মুহূর্তে পছন্দের প্রার্থী বেছে নেবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. আব্দুল আলীমের মতে, এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের অন্যতম নিয়ামক ভূমিকা পালন করবেন তরুণ ভোটাররা। ভোটের যে গতি-প্রকৃতি দেখা যাচ্ছে, তাতে এক প্রার্থীর সঙ্গে আরেক প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান কম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কোনো আসনে তরুণ ভোটাররা যে প্রার্থীর দিকেই ঝুঁকবেন, তারই সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই নির্বাচনে নীরব ভোটারদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন।
