তুরস্ক সফরে শাহবাজ শরিফের কূটনৈতিক তৎপরতা, এরদোগান বৈঠক অপেক্ষায়
তুরস্কের আন্টালিয়া শহরে আয়োজিত আন্টালিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরামে অংশগ্রহণ করতে পৌঁছেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সাথে। শুক্রবার সকালে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ফিদান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজকে ফোরামে অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে প্রকাশ করেন যে, প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর সাথে একান্ত আলোচনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
দ্বিতীয় নিবাস হিসেবে তুরস্কের প্রশংসা
বৈঠকের সময় শাহবাজ শরিফ তুরস্কের আতিথেয়তা ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি তুরস্ককে তার 'দ্বিতীয় নিবাস' হিসেবে আখ্যায়িত করে দুই দেশের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী সৈয়দ তারিক ফাতেমি সহকারী হিসেবে শরিফের সাথে রয়েছেন।
সাইডলাইন বৈঠকে বহুপাক্ষিক আলোচনা
ফোরামের সাইডলাইনে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার একের পর এক বৈঠক করেছেন বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের সাথে। তার বৈঠকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলমেদিন কোনাকোভিচের সাথে সাক্ষাতে দুই দেশের ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনর্নিশ্চিতকরণ
- বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শক্তিশালীকরণ এবং আঞ্চলিক উন্নয়নে পাকিস্তানের গঠনমূলক ভূমিকা নিয়ে পর্যালোচনা
- উত্তর সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাহসিন এরতুগ্রুলোগলু এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কৌশলগত গোয়েন্দা বিষয়ক উপ-মন্ত্রী জিয়ং ইয়োন্ডুর সাথে পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা
ফোরামে পাকিস্তানের সক্রিয় অংশগ্রহণ
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আন্টালিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদানের পাশাপাশি 'ম্যাপিং টুমরো, ম্যানেজিং আনসার্টেনিটিজ' শীর্ষক একটি বিশেষ প্যানেল আলোচনায় অংশ নেবেন। এই আলোচনায় তিনি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত অবস্থান তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
তুরস্ক সফরের প্রেক্ষাপট
তুরস্ক সফরের আগে শাহবাজ শরিফ সৌদি আরব ও কাতার সফর সম্পন্ন করেছেন। সৌদি আরবে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে বৈঠকে তিনি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় দেশটির অবদানের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে কাতারের আমিরের সাথে আলোচনায় তিনি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও পাকিস্তানের ভূমিকা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া ভয়াবহ সংঘাতের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল একটি গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংঘাতে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই সংকট নিরসনে পাকিস্তান গত ১১ এপ্রিল দুই সপ্তাহের জন্য একটি সর্বজনীন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদের ইসলামাবাদে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনার পরও কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং হরমুজ প্রণালি সচল করার লক্ষ্যে শাহবাজ শরিফের এই তুর্কি সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের মতো আঞ্চলিক শক্তির সাথে পাকিস্তানের এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে একটি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সাথে আসন্ন বৈঠকে শান্তি প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়গুলো গভীরভাবে আলোচিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



